Showing posts with label Rimbaud. Show all posts
Showing posts with label Rimbaud. Show all posts
Wednesday, May 19, 2021
Jean Arthur Rimbaud : নরকে এক ঋতু -- অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
Jean Arthur Rimbaud : নরকে এক ঋতু । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
আগে কোনো এক সময়ে, যদি ঠিকমতম মনে থাকে, আমার জীবন ছিল ভুরিভোজের উৎসব যেখানে প্রতিটি হৃদয় নিজেকে মেলে ধরত, সেখানে অবাধে বয়ে যেতো সব ধরণের মদ ।
একদিন সন্ধ্যায় আমি সৌন্দর্য্যকে জড়িয়ে ধরলুম -- আর তাকে আমার তিতকুটে মনে হলো -- আর আমি ওকে অপমান করলুম ।
বিচারের বিরুদ্ধে নিজেকে করে তুললুম ইস্পাতকঠিন ।
আমি পালালুম । ওহ ডাইনিরা, ওহ দুর্দশা, ওহ ঘৃণা, আমার ঐশ্বর্য্য ছিল তোমাদের হেফাজতে।
যাবতীয় মানবিক আশা আমি নিজের মধ্যে নষ্ট করে ফেলেছি । বিরূপ জানোয়ারের নিঃশব্দ লাফ নিয়ে আমি গলা টিপে মেরে ফেলে দিয়েছি প্রতিটি আনন্দ ।
আমি জল্লাদদের আসতে বলেছি ; আমি তাদের বন্দুকের নল চিবিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে চাই। আমি বালি আর রক্তে রুদ্ধশ্বাস হবার জন্য নিম্নত্রণ করেছি মহামারী রোগদের । দুর্ভাগ্য ছিল আমার ঈশ্বর । আমাকে পাঁকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, আর নিজেকে শুকিয়ে নিয়েছি অপরাধাত্মক হাওয়ায়। আমি উন্মাদনার সীমায় নিজেকে নিয়ে গিয়ে মূর্খের খেলা খেলেছি ।
আর বসন্তঋতুর দিনগুলো আমাকে এনে দিয়েছে বোকার আতঙ্কিত হাসি ।
এখন কিছুদিন হলো, যখন আমি নিজেকে ভবিষ্যত অমঙ্গলের বার্তাবাহক হিসাবে আবিষ্কার করলুম, আমি ভাবতে লাগলুম পুরোনো দিনকালের ভোজনোৎসবের উৎসসূত্রের কথা, যেখানে আমি খুঁজে পাবো আবার নিজের বাসনার আকাঙ্খা ।
সেই উৎসসূত্র হলো সর্বজনে প্রীতি -- এই ধারণা প্রমাণ করে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলুম !
যে দানব একসময়ে আমাকে অমন সুন্দর আফিমফুলের মুকুট পরিয়েছিল, চিৎকার করে বলে ওঠে: “তুমি হায়েনা ইত্যাদি জানোয়ার হয়েই বেঁচে থাকবে”...। “মৃত্যুকে খুঁজবে তোমার আকাঙ্খাপুর্তির মাধ্যমে, আর যাবতীয় স্বার্থপরতা দিয়ে, আর সাতটি মারাত্মক পাপ দিয়ে।”
আহ ! আমি সেসব অনেক সহ্য করেছি : তবু, হে প্রিয় শয়তান, অমন বিরক্তমুখে তাকিও না, আমি তোমার কাছে আবেদন করছি ! আর যতোক্ষণ অপেক্ষা করছি কয়েকটা পুরোনো কাপুরুষতার খাতিরে, কেননা তুমি একজন কবির মধ্যে সমস্ত রকমের চিত্রানুগ কিংবা নীতিমূলক স্বাভাবিকতার অভাবকে গুরুত্ব দাও, আমি তোমাকে এক অভিশপ্ত আত্মার রোজনামচা থেকে এই কয়েকটা অপবিত্র পৃষ্ঠা পাঠিয়ে দিচ্ছি ।
বদ রক্ত
ফরাসি দেশের প্রাচীন অধিবাসী গলদের থেকে আমি পেয়েছি আমার ফিকে নীল চোখ, একখানা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক, আর প্রতিযোগীতায় আনাড়িপনা । আমার মনে হয় আমার জামাকাপড় তাদের মতনই অমার্জিত ।
কিন্তু আমি চুলে তেল লাগাই না ।
সেই প্রাচীন অধিবাসী গলরা ছিল তাদের সময়ের অত্যন্ত মূর্খ চামার আর খড় পোড়ানোর দল। তাদের কাছ থেকে আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি : প্রতিমা-উপাসনা, আর যা-কিছু পবিত্র তাকে নোংরা করে দেবার প্রতি টান ; ওহ ! যতোরকমের কদভ্যাস হতে পারে, ক্রোধ, লাম্পট্য, -- ভয়ানক ব্যাপার, এই লাম্পট্য ; -- তাছাড়া মিথ্যে কথা বলা, আর সবার ওপরে আলস্য ।
যাবতীয় ব্যবসাপাতি আর কাজকারবার সম্পর্কে আমি বেশ আত্ঙ্কে ভুগি । কর্তাব্যক্তিদের আর খেটে-খাওয়া লোকেদের সম্পর্কে, ওরা সব্বাই চাষাড়ে আর মামুলি । যে হাত কলম ধরে থাকে তা লাঙল ধরে থাকা হাতের মতনই শুভ। -- হাতের ব্যাপারে একটা শতাব্দী বলা যায় ! -- আমি কোনোদিনও আমার হাত ব্যবহার করতে শিখবো না । আর হ্যাঁ, পারিবারিক ঝুঠঝামেলা তো আরও এক কাঠি বাড়া । ভিক্ষা চাওয়ার মালিকানা আমাকে লজ্জা দেয় । অপরাধীরা অণ্ডকোষহীন পুরুষদের মতোই নিদারুণ বিরক্তিকর : আমি আছি বহাল তবিয়তে, আর আমি কাউকে পরোয়া করি না ।
কিন্তু ! কে আমার জিভকে এতো বেশি মিথ্যা-সুদর্শনে ভরে তুলেছে, যা কিনা আমাকে এতোদিন পর্যন্ত পরামর্শ দিয়েছে আর অলস করে রেখেছে ? আমি তো আমার জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে শরীরকেও ব্যবহার করিনি । ঘুমন্ত কোলাব্যাঙের আলস্যকে ছাপিয়ে, আমি সব রকমের জায়গায় বসবাস করেছি । ইউরোপে এমন কোনো পরিবার নেই যাদের আমি চিনি না। -- পরিবার বলতে, আমি বোঝাতে চাইছি, যেমন আমার, যারা মানুষের অধিকারের ফতোয়ার জোরে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে । -- আমি প্রতিটি পরিবারের সবচেয়ে বড়ো ছেলেকে চিনি!
-------------------------------
যদি ফ্রান্সের ইতিহাসের কোনো একটা সময়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকতো !
কিন্তু তার বদলে, কিছুই নেই ।
আমি ভালো করেই জানি যে আমি চিরটাকাল এক নিকৃষ্টতর জাতির মানুষ । আমি দ্রোহ ব্যাপারটা বুঝতে পারি না । নেকড়ের পালের মতন কোনো জানোয়ারকে ছিঁড়ে খাবার জন্য, যা তারা নিজেরা মারেনি, আর লুঠপাচার বাদ দিলে, আমার জাতি কখনও উঠে দাঁড়ায়নি ।
খ্রিস্টধর্মের বাড়ির বড়ো মেয়ে ফ্রান্সের ইতিহাস আমার মনে আছে । পবিত্র ভূমির জন্যে ক্রুসেডে লড়তে, আমিও চলে যেতে পারতুম, একজন গ্রাম্য চাকর হিসাবে ; আমার মগজের ভেতরে ব্যাভেরিয়ার বনানীর ভেতর দিয়ে অজস্র পথ রয়েছে, বসফরাসের বাইজেনটিয়াম সাম্রাজ্যের ছবি, জেরুজালেমের কেল্লা ; মেরির পুজোপদ্ধতি, ক্রুশকাঠে ঝোলানো যিশুর সম্পর্কে দুঃখদায়ক চিন্তা, আমার মগজের ভেতরে হাজার অবজ্ঞায় পুলকিত হতে থাকে। -- রোদ্দুরের কামড়ে ধ্বসে পড়া দেয়ালের কিনারায়, ভাঙাচোরা মাটির বাসনকোসন আর বিছুটিবনের মাঝে আমি একজন কুষ্ঠরোগির মতন বসে থাকি । --- আর তাছাড়া, আমি একজন উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরে ভাড়াটে সৈনিক, জার্মান রাত্রির আকাশের তলায় সময় কাটাতুম ।
আহ ! আরেকটা ব্যাপার : বুড়ি আর বাচ্চাদের দলের সঙ্গে অত্যুজ্জ্বল লালচে ফাঁকা মাঠে আমি স্যাবাথছুটির নাচ নেচে চলেছি ।
আমি এই দেশ আর খ্রিস্টধর্মের বিষয়ে বিশেষ কিছুই মনে রাখতে পারিনি । আমি নিজেকে চিরটাকাল অতীতে দেখতে পাবো । কিন্তু সবসময়ে একা ; পরিবারহীন ; প্রকৃতপক্ষে, কোন সেই ভাষা, যাতে আমি কথা বলতুম ? আমি কখনও নিজেকে যিশুখ্রিস্টের পারিষদবর্গের সদস্য হিসেবে দেখি না ; সন্তদের সভাতেও নয়, -- যারা যিশুখ্রিস্টের প্রতিনিধি ।
এক শতক আগে আমি ঠিক কী ছিলুম : আজকে আমি কেবল নিজেকে খুঁজে পাই । টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো সেইসব লোকগুলো, ধূসর যুদ্ধগুলো উধাও হয়ে গেছে । নিকৃষ্ট জাতি চেপে বসেছে সবার ওপরে -- যাকে লোকে বলে জনসাধারণ, যুক্তিপূর্ণতা ; রাষ্ট্র এবং বিজ্ঞান ।
আহ ! বিজ্ঞান ! সমস্তকিছু অতীত থেকে নিয়ে আসা হয় । শরীর আর আত্মার জন্যে, -- শেষ আধ্যাত্মিক সংস্কার, -- আমাদের রয়েছে ওষুধ আর দর্শনতত্ব, বাড়িতে সারিয়ে তোলার টোটকা আর নতুনভাবে বাঁধা লোকগান । এবং রাজকীয় আমোদপ্রমোদ, আর যে সমস্ত খেলাধুলা রাজারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ! ভূগোল, আকাশবিদ্যা, যন্ত্রবিদ্যা, রসায়ন !...
বিজ্ঞান, নবতর আভিজাত্য ! প্রগতি । জগতসংসার এগিয়ে চলেছে !.... আর কেনই বা তা করবে না ?
আমাদের রয়েছে গণিতের দৃষ্টিপ্রতিভা । আমরা এগিয়ে চলেছি প্রাণচাঞ্চল্যের দিকে । আমি যা বলছি তা অমোঘ রহস্যপূর্ণ এবং ধ্রুবসত্য । আমি বুঝতে পারি, আর যেহেতু আমি পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট শব্দাবলী ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করতে পারি না, আমি বরং চুপ করে থাকবো ।
পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট রক্ত ফিরে বইতে থাকে শরীরে ! প্রাণচাঞ্চল্য এখন আয়ত্বে, যিশু কেন আমাকে সাহায্য করেন না, কেন আমার আত্মাকে আভিজাত্য আর স্বাধীনতা দেন না । আহ ! কিন্তু যিশুর উপদেশাবলী তো অতীতের ব্যাপার ! খ্রিস্টের উপদেশাবলী ! খ্রিস্টের উপদাশাবলী !
আমি হাঘরের মতন ঈশ্বরের জন্যে অপেক্ষা করি । আমি চিরকালের জন্যে, চিরকালের জন্যে, এক নিকৃষ্ট জাতের মানুষ ।
আর এখন আমি উত্তরপশ্চিম ফ্রান্সের ব্রিট্যানির সমুদ্রতীরে । শহরগুলো সন্ধ্যায় তাদের আলোকমালা জ্বালিয়ে দিক । আমার দিনকাল ফুরিয়ে গেছে ; আমি ইউরোপ ছেড়ে চলে যাচ্ছি । সমুদ্রের হাওয়া আমার ফুসফুসকে গরম করে তুলবে ; হারিয়ে-যাওয়া আবহাওয়া আমার ত্বককে পালটে ফেলবে চামড়ায় । সাঁতার কাটার জন্যে, ঘাসভূমি মাড়িয়ে চলার জন্যে, শিকার করার জন্যে, সবচেয়ে প্রিয় ধোঁয়াফোঁকার জন্যে ; কড়া মদ খাবার জন্যে, সে মদ গলিয়ে ফেলা লোহার মতন কড়া, -- আগুনের চারপাশে আমার প্রণম্য পূর্বপুরুষরা যেমন ভাবে বসে থাকতেন ।
আমি লোহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ফিরে আসবো, কালো ত্বক, আর রাগি দুটো চোখ : এই মুখোশে, ওরা সবাই মনে করবে আমি উৎকৃষ্ট জাতির মানুষ । আমার কাছে থাকবে স্বর্ণভাঁড়ার : আমি হয়ে উঠবো নৃশংস আর শ্রমবিমুখ । যে দুর্ধষ্য পঙ্গুরা গ্রীষ্মমণ্ডলের দেশ থেকে ফিরে আসে, তরুণীরা তাদের সেবা করে । আমি রাষ্ট্রনীতিতে জড়িয়ে পড়বো । বেঁচে যাবো ।
এখন আমি অভিশপ্ত, আমি আমার নিজের দেশকে অপছন্দ করি । সবচেয়ে ভালো হলো মাতাল অবস্হায় ঘুমোনো, চিলতেখানেক কোনো সমুদ্রতীরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়া ।
--------------------------
কিন্তু কেউই ছেড়ে চলে যায় না । --- আরেকবার বেরিয়ে পড়া যাক আমাদের এলাকার পথে-পথে, আমার অধার্মিকতার ভার সঙ্গে নিয়ে, সেই অধার্মিকতা যা যুক্তিপূর্ণতার যুগ থেকে আমার অস্তিত্বে দুঃখকষ্টের শিকড় পুঁতে দিয়েছে -- স্বর্গ পর্যন্ত উঠে যাওয়া, আমাকে বিদ্ধস্ত করে, ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায়, আমাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যায় ।
চরম পাপহীনতা, শেষ মায়া । সবকিছু বলা হয়ে গেছে । পৃথিবীতে আমার জঘন্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার নয় ।
চলে এসো ! কুচকাওয়াজ করে, ভার কাঁধে তুলে, মরুভূমি, একঘেয়েমির বিরক্তি এবং ক্রোধ নিয়ে।
কার কাছে গিয়ে ভাড়া করা মজুর হবো ? কোন সে জানোয়ারদের আদর করি ? কোন পবিত্র মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করি ? কেমনতর হৃদয়কে ভাঙি ? কোন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিই ? -- কোন সে রক্তের নদী হেঁটে পার হই ? বরং বিচার থেকে দূরত্ব রাখা ভালো । -- এক কঠিন জীবন, সুস্পষ্ট বিস্ময়, -- কফিনের ঢাকা তোলার জন্যে একটা শুকনো মুঠো, শুয়ে থাকো, আর দম বন্ধ হয়ে যাক । এইভাবে বার্ধক্যে পৌঁছোবার কথা নয়, কোনো বিপদ নেই : সন্ত্রাস ব্যাপারটা অ-ফরাসী।
--আহ ! আমি এমন পরিত্যক্ত যে নিজেকে কোনও না কোনও স্মৃতিমন্দিরে গিয়ে নিখুঁত হবার আবেগ উৎসর্গ করব ।
ওহ আমার আত্ম-অস্বীকৃতি, আমার মনোমুগ্ধকর বিশ্বপ্রেম ! আমার নিঃস্বার্থপর ভালোবাসা ! অথচ তবু আমি এই তলানিতে !
গভীর অতল থেকে কেঁদে উঠি, আমি আসলে একটা গাধা !
----------------------------------
যখন আমি এক ছোট্ট শিশু ছিলুম, আমি সেই দণ্ডিত অপরাধীকে শ্রদ্ধা করতুম যার মুখের ওপর কারাগারের দরোজা সদাসর্বদা বন্ধ থাকবে ; আমি সেই সমস্ত মদের আসর আর ভাড়াদেয়া ঘরগুলোয় যেতুম যেগুলোকে তার উপস্হিতি পবিত্রতায় উন্নীত করেছে ; আমি তার চোখ দিয়ে নীলাকাশ আর ফুলে ছাওয়া মাঠের কর্মোন্মাদনা দেখতুম ; শহরের রাস্তায় আমি তার সর্বনাশা সুগন্ধকে অনুসরণ করেছি । তার ছিল সন্তদের চেয়েও বেশি ক্ষমতা, যেকোনো অনুসন্ধানকারীর চেয়েও বেশি বোধশক্তি -- আর সে, কেবল সে-ই ! নিজের মহিমা এবং নিজের ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষী ছিল ।
শীতের রাতের ফাঁকা রাস্তা-বরাবর, ঘরছাড়া, ঠাণ্ডায় কাতর, আর ক্ষুধার্ত, একটা কন্ঠস্বর আমার হিমায়িত হৃদয়কে আঁকড়ে ধরল : “দুর্বলতা হোক বা শক্তিমত্তা : তুমি টিকে আছো, তাইই হলো শক্তিমত্তা । তুমি জানো না তুমি কোথায় চলেছো কিংবা কেন তুমি কোথাও যাচ্ছো, যেদিকে চাও যাও, সবাইকে জবাব দাও । কেউই তোমাকে মেরে ফেলবে না, তুমি শবদেহ হলে যেরকম করতো তার চেয়ে বেশি কিছু নয় ।” সকালবেলায় আমার চোখদুটো এতো বেশি ফ্যালফ্যালে হয়ে উঠেছিল আর মুখ শবের মতন ফ্যাকাশে, যে যাদের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছিল তারা যেন আমায় দেখতে পাচ্ছিল না ।
শহরগুলোয়, কাদার রঙ আচমকা বদলে গিয়ে লাল আর কালো হয়ে উঠল, পাশের ঘরে আলোর শিখা কাঁপলে আয়নায় যেমন হয়, জঙ্গলে গুপ্তধনের মতন ! আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, গুড লাক, আর আমি দেখতে পেলুম আগুনশিখার সমুদ্র আর ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে ; এবং বাঁদিকে আর ডানদিকে, কোটি-কোটি বজ্রবিদ্যুতের মতন সমস্ত ঐশ্বর্য্য বিস্ফোরণে ফেটে পড়ছিল।
কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল পানোমত্ততা এবং নারীসঙ্গ ছিল আমার পক্ষে অসম্ভব । এমনকি কোনো বন্ধুসঙ্গও নয় । আমি দেখলুম আমি একদল রাগি মানুষদের সামনে পড়ে গেছি, ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি, তারা যে দুঃখে কাঁদছিল তা তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছিল না, আর ক্ষমা করে দিচ্ছিল ! ঠিক যেন জোয়ান অব আর্ক ! -- “যাজকরা, অধ্যাপকরা আর ডাক্তাররা, আপনারা আমাকে আইনের হাতে তুলে দিয়ে ভুল করছেন । আমি কখনও আপনাদের একজন ছিলুম না; আমি কখনও খ্রিস্টধর্মী ছিলুম না ; আমি সেই জাতির মানুষ যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গায়; আমি তোমাদের আইনকানুন বুঝি না ; আমার নৈতিক জ্ঞানগম্যি আছে ; আমি ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য ; তোমরা একটা বড়ো ভুল করে ফেলছো…”
হ্যাঁ, তোমাদের ঝলমলে আলোয় আমার চোখ বন্ধ । আমি একটি পশু, একজন কৃষ্ণাঙ্গ । কিন্তু আমার পরিত্রাণ সম্ভব । তোমরা সব নকল কৃষ্ণাঙ্গ ; বাতিকগ্রস্ত, বুনো, কৃপণ, তোমরা সবাই । ব্যবসাদার, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; জজসাহেব, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সেনাপতি, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সম্রাট, বুড়ো চুলকানো-মাথা, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; তুমি শয়তানের হেফাজত থেকে যে মদ খেয়েছো তাতে কেউ কর বসায় না । -- এই দেশকে উৎসাহিত করে জ্বরের তাপ আর কর্কটরোগ । পঙ্গু আর বুড়ো মানুষেরা এতো বেশি শ্রদ্ধার পাত্র যে তারা চায় তাদের উষ্ণতাপে সেদ্ধ করা হোক । -- সবচেয়ে ভালো হবে এই মহাদেশ ছেড়ে বিদায় নেয়া, যেখানে এই হতভাগাগুলোকে প্রতিভূ সরবরাহ করার জন্যে পাগলামি জিনিশটা ঘুরঘুর করে বেড়ায় । আমি প্রবেশ করবো ক্যাম্বোডিয়ার সত্যকার চাম রাজার সন্তানদের দেশে ।
আমি কি প্রকৃতিকে বুঝতে পারি ? আমি কি নিজেকে বুঝতে পারি ? কোনও বাক্য আর আয়ত্বে নেই । আমি মৃত মানুষদের নিজের পাকস্হলিতে পুরে রাখি...হইহট্টোগোল, ঢোলঢোলোক, নাচো, নাচো, নাচো ! আমি সেই মুহূর্তের কথা চিন্তাও করতে পারি না যখন শ্বেতাঙ্গ মানুষরা পোঁছেচে, আর আমি শুন্যতায় তলিয়ে যাবো ।
পিপাসা আর ক্ষুধা, হইহট্টোগোল, নাচো, নাচো নাচো !
-----------------------------
শ্বেতাঙ্গরা তীরে নামছে । কামানের গোলার আওয়াজ ! এখন আমাদের নির্ঘাত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হবে, পোশাক পরে তৈরি হও, আর কাজে বেরোও ।
আমার হৃৎপিণ্ডকে ঈশ্বরিক করুণায় বিদ্ধ করা হয়েছে । আহ ! আমি কখনও ভাবিনি যে আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটবে !
কিন্তু আমি কোনও অন্যায় তো করিনি । আমার দিনগুলো হয়ে উঠবে স্বস্তিময়, এবং পশ্চাত্তাপ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়া হবে । যেখানে আনাড়ম্বর আলোকমালা শোকসভার মোমবাতির মতন আরেকবার জ্বলে ওঠে, আমাকে আধমরা আত্মার শুভত্বে পীড়ন করা হবে না । প্রথম সন্তানের অদৃষ্ট, সময়ের আগেই জন্মানো কফিন যা ঝিলমিলে কান্নাফোঁটায় ঢাকা । কোনও সন্দেহ নেই, ন্যায়ভ্রষ্টতা হলো বোকামি, কদভ্যাস হলো বোকামি ; পচনবিকারকে সদাসর্বদা দূরে সরিয়ে রাখতে হবে । কিন্তু দেয়ালঘড়িকেও শিখতে হবে বিশুদ্ধ যন্ত্রণার সময়নির্দেশের চেয়ে বেশিবার কাঁসরঘণ্টা কেমন করে বাজাতে হয় ! এই সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে, আমাকে কি শিশুর মতন তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে স্বর্গোদ্যানে গিয়ে খেলা করতে পারি ! তাড়াতাড়ি করো ! সেখানে কি অন্যান্য জীবনও আছে ? -- বৈভবশালীদের পক্ষে শান্তিতে ঘুমোনো অসম্ভব । ঈশ্বর্য্য চিরকাল সবায়ের সামনে খোলামেলা থাকে । কেবল জ্ঞানের চাবিকাঠি দিতে পারে দেবোপম প্রেম। আমি তো দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতি একধরণের দয়ামায়ার প্রদর্শনী । বিদায় বিশপের আঙরাখায় ঢাকা আগুনের নিঃশ্বাস-ওড়ানো দানব, আদর্শবোধ আর ভুলভ্রান্তি ।
উদ্ধারকারী জাহাজ থেকে ভেসে আসছে দেবদূতদের উদ্দেশ্যময় গান : এ হলো দেবোপম ভালোবাসা। -- দুটি ভালোবাসা ! আমি জাগতিক প্রেমে মরে যেতে পারি, আনুগত্যের কারণে মরে যেতে পারি । আমি পেছনে ফেলে যাচ্ছি সেই সমস্ত প্রাণীদের, আমি চলে যাবার পর যাদের যাতনা ক্রমশ বাড়তে থাকবে ! বাতিলদের মধ্যে থেকে তুমি আমাকে বেছে নিয়েছো, যারা রয়ে গেলো তারা কি আমার বন্ধু নয় ?
তাদের অমঙ্গল থেকে বাঁচাও !
আমি নিমিত্তসিদ্ধির খাতিরে দ্বিতীয়বার জন্মেছি । জগৎসংসার বেশ শুভময় । আমি জীবনকে আশীর্বাদ করবো । আমি আমার ভাইবেরাদরদের ভালোবাসবো । বাল্যকালীন প্রতিজ্ঞার ব্যাপার আর নেই। বার্ধক্য আর মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার আশা নেই । ঈশ্বর আমার শক্তি, এবং আমি ঈশ্বরের বন্দনা করি ।
----------------------------
একঘেয়েমি-জনিত বিরক্তিকে আমি আর পছন্দ করি না । দুর্বার-ক্রোধ, বিকৃতকাম, উন্মাদনা, যাদের সব কয়টি স্পন্দনাঘাত আর দুর্বিপাকের সঙ্গে আমি পরিচিত, -- আমার সম্পূর্ণ ভার লাঘব হয়েছে । এবার আমার অপরাধশূন্যতার সীমাকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করা যাক।
প্রহারের সন্তুষ্টি চাইবার মতন অবস্হায় আমি আর নেই । আমি কল্পনা করি না যে আমার শ্বশুর যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে আমি মধুচন্দ্রিমায় বেরিয়েছি ।
আমি আমার নিজের যুক্তিজালে আটক জেলবন্দি নই । আমি তো বলেছি । হে ঈশ্বর । আমি উত্তরণের মাধ্যমে স্বাধীনতা চাই : আমি কেমন করে সেই দিকে যাবো ? ছেলেমানুষির সেই স্বাদ আর নেই । আর দরকার নেই দেবোপম ভালোবাসার কিংবা কর্তব্যের প্রতি উৎসর্জন। আমি ছেলেবেলার আবেগ ও অনুভবের ত্রুটিকে দোষ বলে মনে করিনা । যে যার নিজের যুক্তিপূর্ণতায়, অবজ্ঞায়, সর্বজনপ্রীতিতে রয়েছে : শুভবুদ্ধির দেবদূতোপম সিঁড়ির সবচেয়ে ওপরের ধাপে নিজেকে রেখেছি আমি ।
আর যদি সুস্হিত আনন্দের কথা বলতে হয়, গার্হস্হ হোক বা না হোক...। না, আমি পারবো না। আমি বড়ো বেশি তুচ্ছ, অত্যন্ত দুর্বল । কর্মকাণ্ড জীবনকে কুসুমিত করে তোলে, ওটা পুরোনো ধ্যানধারণা, আমার নয় ; আমার জীবন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা কর্মকাণ্ডের থেকে দূরে লক্ষ্যহীন ভেসে চলে যায়, পৃথিবীর সেই তৃতীয় মেরুঅঞ্চলে ।
বুড়ি চাকরানি হয়ে যাচ্ছি আমি, মৃত্যকে ভালোবাসার সাহস হারিয়ে ফেলেছি !
ঈশ্বর যদি আমাকে সেই দিব্যশান্তি দিতেন, নির্মল প্রশান্তি, এবং প্রার্থনা, -- প্রাচীনকালের সন্তদের মতন -- সেই সন্তরা ! তাঁরা ছিলেন শক্তিমন্ত ! নোঙোর, এমনই এক ধরণের শিল্পী যাঁদের প্রয়োজন আর আমাদের নেই !
এই প্রহসনের কি এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন ? আমাকে কাঁদাবার জন্যে আমার শুদ্ধতা যথেষ্ট। জীবন নামের প্রহসনে সবাইকে খেলতে হবে ।
--------------------------
এবার থামাও ! এটা তোমার শাস্তি । -- কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যাও !
আহ ! আমার ফুসফুস জ্বলছে, কপাল দপদপ করছে ! রাত্রি ঘনিয়ে আসছে আমার চোখে, এই সূর্যের তলায় ! আমার হৃদয়….আমার দুই হাত আর পাদুটো….
আমরা কোথায় চলেছি ? যুদ্ধ করতে ? আমি বেশ দুর্বল ! অন্যেরা এগিয়ে চলেছে । যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র...আমাকে সময় দাও !
গুলি চালাও ! আমাকে তাক করে গুলি চালাও ! নয়তো আমি তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবো নিজেকে । -- ভিতুর দল ! -- আমি নিজেকে খুন করবো ! আমি নিজেকে ঘোড়ার খুরের তলায় নিক্ষেপ করবো !
আহ !
--আমি এ-সবে অভ্যস্ত হয়ে যাবো ।
সেটাই হবে ফরাসি উপায়, শৌর্যের পথ ।
নরকে এক রাত
আমি এক্ষুনি মুখভরা ভয়ানক বিষ গিলে ফেলেছি । -- আমাকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল তাতে আমি মহিমান্বিত, মহিমান্বিত, মহিমান্বিত ! -- আমার নাড়িভূঁড়িতে আগুন ধরে গেছে । বিষের ক্রিয়াক্ষমতায় আমার দুই হাত আর পাদুটো মুচড়ে উঠছে, পঙ্গু করে দিচ্ছে, মাটিতে থুবড়ে ফেলে দিয়েছে । তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে, আমি কাঁদতে পারছি না । এ হলো নরক, অনাদি-অনন্ত যন্ত্রণাভোগ ! দ্যাখো আগুনের শিখা কেমনভাবে ওপরে উঠে যাচ্ছে ! আমার যাওয়া উচিত, আমি জ্বলেপুড়ে মরছি । চালিয়ে যাও, হে শয়তান !
আমি একবার শুভের সঙ্গে আর প্রকাশসৌষ্ঠভের সঙ্গে কথা কইবার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলুম, পাপের শাস্তি হিসাবে নরকভোগ থেকে মুক্ত । কেমন করেই বা আমি নিজের দৃষ্টিপ্রতিভা বর্ণনা করবো, নরকের বাতাস বন্দনাগান গাইবার পক্ষে বড্ডো গাঢ় ! সুসংবদ্ধ আত্মিক ঐকতান, বলিষ্ঠতা এবং শান্তি, অভিজাত উচ্চাশা, তাছাড়া জানি না আরও কি ছিল সেখানকার লক্ষ-লক্ষ পরমানন্দিত প্রাণীদের ?
পরমানন্দের উচ্চাশা !
কিন্তু তবু আমি বেঁচে আছি ! -- মনে করো নরকযন্ত্রণা হলো শাশ্বত ! একজন মানুষ যে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে চাইছে সে নিশ্চয়ই অভিশপ্ত, নয়কি ? আমার বিশ্বাস আমি নরকে রয়েছি, তার মানে আমি বেঁচে আছি । এই প্রশ্নোত্তরপর্বই কাজ করে চলেছে । আমি আমার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত কেনা-গোলাম । তোমরা, আমার বাপ-মা, আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছো, আর নিজেদের জীবনও । বেচারা খোকা ! -- পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে নরক ক্ষমতাহীন । -- আমি তবু বেঁচে আছি! পরে, নরকযন্ত্রণার মহানন্দ হয়ে উঠবে আরও নিগূঢ় । একটা অপরাধ, দ্রুত, আর মানুষের আইনে দণ্ডাদেশ পাওয়া আমাকে শূন্যতায় তলিয়ে যেতে দাও ।
চুপ করো, তুমি কি চুপ করবে !...এখানে সবকিছুই লজ্জাকর আর কলঙ্কিত ; শয়তান বলছে যে আগুনটার কোনও মানে হয় না, বলছে যে আমার ক্রোধ হলো হাস্যকর এবং নির্বোধ। -- আহ, থামো দিকিনি !...কেউ ফিসফিস করে ওই ভুলগুলোর কথা বলেছে, ইন্দ্রজালের সন্মোহন, বোকা-বানানো গন্ধ, শিশুতোষ সঙ্গীত । -- আর এই কথা ভাবা যে আমিই সত্যের অধিকারী, যে আমার আয়ত্বে চলে আসতে পারে বিচারের দৃষ্টিপ্রতিভা : আমার নির্ণয় বিচক্ষণ আর দৃঢ়, নিখুঁত হয়ে ওঠার জন্যে আমি শ্রেষ্ঠগুণসম্পন্ন… গর্ববোধ । -- আমার করোটি চেপে বসছে । দয়া করো ! হে নাথ, আমি সন্ত্রস্ত ! জল দাও, আমার তেষ্টা পাচ্ছে, আমার তেষ্টা পাচ্ছে ! আহ, শৈশব, ঘাসভূমি আর বৃষ্টি, পথের পাথরে জমা জল, যখন রাত বারোটা বাজে তখনকার চাঁদের আলো….শয়তান দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘড়িমিনারের ছাদে, ঠিক এখনই ! মেরি । পবিত্র অক্ষতযোনি !...ভয়ংকর মূর্খতা।
ওই দিকে তাকাও, ওরা কি মাননীয় মানুষ নয়, যারা আমার ভালো চেয়েছে ?...এসো...মুখের ওপরে বালিশ, ওরা আমাকে শুনতে পাবে না, ওরা তো কেবল প্রেত।
যাই হোক, কেউ আর অন্য কারোর কথা ভাবে না । ওদের কাছে আসতে দিও না । আমার গা থেকে নিশ্চয়ই পোড়া মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে ।
আমার অলীকদৃশ্যগুলো অসংখ্য । এগুলোই আমাকে সব সময় সহ্য করতে হয়েছে : ইতিহাস সম্পর্কে আমার বিশ্বাসহীনতা, আদর্শগুলোকে উপেক্ষা । আমি এই বিষয়ে আর কোনও কথা বলব না : কবিরা এবং দ্রষ্টারা ঈর্ষা করবে । আমি সকলের চেয়ে ধনী, কয়েক হাজার গুণ, আর আমি তা সমুদ্রের মতন আগলে রাখবো ।
হে ঈশ্বর -- এক মুহূর্ত আগে জীবনের ঘড়ি থেমে গেছে । আমি আর পৃথিবীর অন্তর্গত নই। -- ব্রহ্মবিদ্যা সঠিক ; নরক নিশ্চয়ই নিচের দিকে -- এবং স্বর্গ ওপরদিকে । -- ভাবাবেশ, দুঃস্বপ্ন, ঘুম, আগুনের নীড়ের ভেতরে ।
দেশের মধ্যে কেমন করে অলস ঘুরে বেড়ায় মন...শয়তান, ফার্দিনান্দ, বুনো বীজের সঙ্গে উড়ে যায়...যিশুখ্রিস্ট ময়ূরপঙ্খী রঙের কাঁটার ওপর দিয়ে হেঁটে যান কিন্তু তাদের নত করেন না...যিশু হেঁটে যেতেন চঞ্চল সমুদ্রের ওপর দিয়ে । লন্ঠনের আলোয় আমরা ওনাকে সেখানে দেখেছি, শ্বেতবসনে, দীর্ঘ বাদামি চুল, পান্নারঙা এক ঢেউয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন ।
যাবতীয় রহস্যের চাদর আমি ছিঁড়ে ফেলবো : ধর্মের রহস্য হোক কিংবা প্রকৃতি, মৃত্যু, জন্ম, ভবিষ্যৎ, অতীত, সৃষ্টির উৎপত্তিতত্ব, এবং শূন্যতার রহস্য । আমি হলুম মোহাবিষ্ট চোখে-দেখা অলীক ছায়ামূর্তিদের মালিক ।
শোনো !...
প্রতিটি কর্মদক্ষতাই আমার ! -- এখানে কেউ নেই, ওখানে কেউ রয়েছে : আমি আমার ঐশ্বর্য নষ্ট করতে চাইবো না । -- আমি কি তোমাকে আফরিকার বাঁশি শোনাবো, তলপেট-নাচিয়েদের ? আমি কি উধাও হয়ে যাবো, আমি কি চেষ্টা করবো গসপেল-কথিত আঙটি খুঁজে আনার । যাবো? আমি তৈরি করব সোনা আর ওষুধ ।
তাহলে, আমাকে বিশ্বাস করো । বিশ্বাস আরাম দ্যায়, তা পথনির্দেশ করে এবং সারিয়ে তোলে। তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, -- ছোটো বাচ্চারাও -- এসো তোমাদের সান্তনা দিই, তোমাদের সামনে আমার হৃদয়ের কথা মেলে ধরি -- আমার অলৌকিক হৃদয় ! -- হে দরিদ্রগণ, হে দরিদ্র শ্রমিকবৃন্দ ! আমি বন্দনাগান চাইছি না : তোমরা কেবল আমাকে বিশ্বাস করো, আর তাহলেই আমি আনন্দিত হবো ।
-- এবার, আমার কথা ভাবো । এই সবকিছু পৃথিবীকে হারানোর ব্যাপারে আমাকে তাড়িত করে না । আমি ভাগ্যবান যে আমাকে আর যন্ত্রণা পেতে হবে না । আমার জীবন, দুর্ভাগ্যবশত, মিষ্টি বোকামি ছাড়া আর কিছুই ছিল না ।
বাহ ! যতো রকমের কুৎসিত মুখভঙ্গী হতে পারে আমি তা করবো ।
আমরা জগৎসংসারের বাইরে, নিঃসন্দেহে । কোনও শব্দ নেই । স্পর্শের বোধশক্তি আমার চলে গেছে । আহ, আমার দুর্গভবন, আমার স্যাক্সনি, আমার উইলোবনানী ! সন্ধ্যা ও সকাল, রাত আর দিন...আমি কতো ক্লান্ত !
আমার ক্রোধের জন্যে একটা বিশেষ নরক থাকা উচিত ছিল, একটা নরক গর্ববোধের জন্যে, -- এবং একটা নরক যৌনতার জন্যে ; নরকের এক পরিপূর্ণ ঐকতান-সঙ্গীত !
আমি পরিশ্রান্ত, আমি মরে যাচ্ছি । এটাই কবর আর আমি কীটে পরিণত হয়ে চলেছি, আতঙ্ক ছাপিয়ে গেছে আতঙ্ককে ! শয়তান, ভাঁড় কোথাকার, তুই নিজের চমৎকারিত্ব দিয়ে আমাকে গলিয়ে ফেলতে চাইছিস । ঠিক আছে, আমি তাইই চাই । আমি তাই চাই । কোদালকাঁটা দিয়ে আমাকে গিঁথে ফ্যালো, আমার ওপরে আগুনের ফোঁটা ঝরাও ।
আহ ! জীবনে ফিরে যাওয়া ! আমাদের বিকলাঙ্গতার দিকে তাকিয়ে দ্যাখা । আর এই বিষ, এই শাশ্বত অভিশপ্ত আলিঙ্গন ! আমার দুর্বলতা, এবং জগতসংসারের নির্দয়তা ! হে ঈশ্বর, দয়া করো, আমাকে লুকিয়ে ফ্যালো, আমি নিজেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না -- আমি আড়ালে রয়েছি, আর আমি নেইও ।
আর যেমন-যেমন অভিশপ্ত আত্মা জেগে উঠতে থাকে, ঠিক তেমনই আগুনও ।
প্রথম ডিলিরিয়াম : সেই বোকা অক্ষতযোনি মেয়ে
নরকবাসী একজন পুরোনো বন্ধুর আত্মস্বীকৃতি শোনা যাক, “হে প্রভু, হে দিব্য বিবাহের বর, তোমার সবচেয়ে সমব্যথী পরিচারিকাদের আত্মস্বীকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না । আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি । আমি মাতাল । আমি অশুদ্ধ।
এই কি জীবন !
“ক্ষমা করো, স্বর্গের নিবাসী হে প্রভু, ক্ষমা করে দাও ! আহ ! ক্ষমা করো । এই কান্নার জল। এবং আরও যে অশ্রু পরে ঝরতে থাকবে, অনুমান করি !
“পরে, আমি দিব্য বিবাহের বরের সঙ্গে দেখা করবো ! আমি তো জন্মেছিলুম তাঁর কেনা-গোলাম হবার জন্যে । -- ওরা এবার আমাকে পিটুনি দিতে পারে !
“ঠিক এখনই, জগতসংসারের শেষ ! ওহ, মেয়েরা...আমার বন্ধুনিরা !...না, আমার বন্ধুনিরা নয়...আমি কখনও এমনতর অবস্হা সহ্য করিনি, ডিলিরিয়াম, পীড়নসমূহ, সমস্তকিছু...এটা এমন অর্থহীন ।
“ওহ ! আমি কাঁদছি, আমি কষ্ট পাচ্ছি । আমি সত্যিই যন্ত্রণাভোগ করছি । তবু আমার যা ইচ্ছা করার অধিকার রয়েছে, যখন কিনা আমাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে সবচেয়ে অবজ্ঞেয় হৃদয়গুলোর অবজ্ঞা দিয়ে ।
“ঠিক আছে, আমাকে আত্মস্বীকৃতি করতে দেয়া তো হোক, যদিও আমাকে হয়তো তা কুড়িবার নতুন করে আওড়াতে হবে, -- এমনই নীরস, এবং এমনই গুরুত্বহীন !
“আমি নারকীয় বিয়ের বরের একজন কেনা-গোলাম, সেই লোকটা যে বোকা অক্ষতযোনি মেয়েদের ফুসলিয়ে সতীত্বহানি করেছিল । ও একেবারে সেই রকমেরই শয়তান । ও মোটেই মায়াপুরুষ নয়, ও প্রেতও নয় । কিন্তু আমি, যে কিনা নিজের কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি, জগতসংসারের কাছে অভিশপ্ত আর মৃত ,-- কেউই আমাকে খুন করতে পারবে না ! কেমন করে তোমার কাছে তার বর্ণনা করি ! এমনকি আমি কথাও বলতে পারছি না । আমি পরে আছি শোকের পোশাক, আমি কাঁদছি, আমি বেশ ভয়ার্ত । দয়া করো, হে প্রভু, একটু টাটকা বাতাস, যদি তোমার খারাপ না লাগে, দয়া করো !
“আমি এক বিধবা…-- আমি এক সময় বিধবা ছিলুম…--ওহ, হ্যাঁ, তখনকার সময়ে আমি ভীষণ গম্ভীর থাকতুম, আমি কংকাল হয়ে ওঠার জন্য জন্মাইনি !...ও ছিল কচিখোকা কিংবা বলা যায় প্রায়...ওর কোমল, রহস্যময় চালচলন আমাকে পুলকিত করেছিল । ওকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমি আমার সব কর্তব্য ভুলে গেলুম । কি যে এক জীবন আমরা কাটাই ! সত্যকার জীবনের অভাব রয়েছে । আমরা এই জগতসংসার থেকে নির্বাসিত, সত্যি -- ও যেদিকে যায় আমিও সেই দিকে যাই, আমাকে যেতেই হয় । আর বেশির ভাগ সময়ে ও আমার ওপর ক্ষেপে যায়, আমার প্রতি, বেচারা পাপিষ্ঠ । সেই শয়তানটা ! ও সত্যিই একটা শয়তান, তুমি জানো, এবং মোটেই মানুষ নয় ।
“ও বলে : “আমি মেয়েদের ভালোবাসি না । ভালোবাসাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে, আমরা তা জানি । মেয়েরা যা শেষপর্যন্ত চায় তা হল সুরক্ষা । একবার ওরা তা পেয়ে গেলে, প্রেম, সৌন্দর্য্য, সবই জানালার বাইরে কেটে পড়ে : যা তাদের কাছে রয়ে যায় তা হলো তাচ্ছল্য, আজকাল বিবাহ তার ওপরই টিকে থাকে । অনেক সময়ে আমি এমন তরুণীদেরও দেখেছি যাদের খুশি থাকার কথা, যাদের সাথে আমি সঙ্গলাভ করতে পারতুম, কিন্তু তাদের তো আগে থেকেই মাস্তানরা এমন গিলে খেয়েছে যেন কাঠের গুঁড়ি ছাড়া তারা আর কিছুই নয়…”
“আমি ওকে শুনি, বদনামকে শৌর্যে পালটে ফেলছে, নিষ্ঠুরতাকে মায়ায় । “আমি প্রাচীন এক জাতির সদস্য : আমার পুর্বপুরুষরা ছিল ভাইকিং যোদ্ধা : তারা নিজেদের দেহ ফালাফালা করে ফেলতো, নিজেদের রক্ত পান করতো ।---আমি আমার সমস্ত শরীর ফালাফালা করে ফেলবো, উল্কি দেগে দেবো সারা শরীরে , আমি মোঙ্গোলদের মতন কুৎসিত হয়ে উঠতে চাই : তুমি দেখো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করতে চাই । আমি সত্যিই রাগে ফুঁসিয়ে উঠতে চাই । আমাকে হীরে-জওহরত দেখিও না ; আমি চার হাতেপায়ে জাজিমের ওপরে হামাগুড়ি দিয়ে দুমড়ে উঠবো । আমি চাই আমার ধনসম্পত্তি রক্তে জবজবে হয়ে উঠুক । আমি কখনও কোনো কাজ করবো না… “বহুবার, রাতের বেলায়, ওর দানব আমাকে কাবু করেছে, আর আমরা কুস্তির দাঁওপ্যাঁচে গড়াগড়ি খেয়েছি ! -- অনেক সময়ে রাতের বেলায় যখন ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যায় তখন ও রাস্তার আনাচে-কানাচে কিংবা দরোজার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, যাতে আমাকে ভয়ে আধমরা করে দিতে পারে ।-- আমি নির্ঘাৎ আমার গলা কেটে ফেলবো ; তা কি বিরক্তিকর হবে।” আর, ওহ ! সেই দিনগুলো যখন ও খুনি হবার ভান করে !
“অনেক সময়ে ও ওর দেশোয়ালি বুলিতে কথা বলে, তা একেবারে আবেগে ঠাশা, মৃত্যু সম্পর্কে, আর তা কেমন করে আমাদের অনুতপ্ত করে, এবং জগতসংসারে নিশ্চয়ই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ আছে, শ্রমে পরিশ্রান্ত, আর বিদায় জানাবার প্রসঙ্গ তোলে এবং তা কেমন করে তোমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে ফ্যালে । যে নোংরা পানশালাগুলোতে ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যেতো, তখন আমাদের চারিপাশের লোকজনদের দেখে কাঁদতো -- যেন বস্তি-অঞ্চলের গোরুমোষ । অন্ধকার রাস্তায় মাতালদের তুলে নিতো । ছোট্ট খোকাদের জন্য নির্দয় মায়ের দয়ামায়া ছিল ওর । রবিবারের স্কুলের পথে এক ছোট্ট খুকির মতন মধুরস্বভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতো । ও ভান করতো যেন সবকিছুই জানে, ব্যবসাপাতি, শিল্প, ওষুধ । -- আর আমি সবসময় ওর সমর্থন করতুম, আমাকে করতে হতো !
“ও নিজের কল্পনাজগতে যেসব ঝালর ঝুলিয়ে রাখতো তা আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম ; পোশাক-পরিচ্ছদ, কারিগরি, আসবাবপত্র….আমিই ওকে অস্ত্র ধার দিয়েছিলুম, আর মুখভঙ্গীতে রদবদল । ওকে যাকিছু প্রভাবিত করতো তা আমি টের পেতুম, ঠিক যেমনভাবে ও নিজেকে কল্পনা করে নিতো । যখনই ওকে মনে হয়েছে হতোদ্যম, আমি ওকে অদ্ভুত দুর্বোধ্য অভিযানে অনুসরণ করতুম, চলেছি তো চলেইছি, শুভ হোক বা অশুভ : কিন্তু আমি সবসময়ে জানতুম যে আমি ওর জগতের অংশীদার হতে পারবো না । ওর প্রিয় দেহের পাশে, শুয়ে থাকার সময়ে, জেগে থাকতুম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত, ভাবতে চেষ্টা করতুম যে কেন ও বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে চায় । এর আগে আর কোনো লোকের এই রকম ইচ্ছে হয়নি । আমি বুঝতে পেরেছিলুম, ওর সম্পর্কে বিনা ভয়ে -- যে, সমাজের পক্ষে ও ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে । ওর কি, হয়তো, এমন কিছু গোপন ব্যাপার ছিল যা ওর জীবনের নবীকরন ঘটাবে ? না, আমি নিজেকে বলেছি, ও কেবল সেগুলোকে অনুসন্ধান করছিল । কিন্তু তবু, ওর বদান্যতা এক সন্মোহনে আবৃত, এবং আমি তাতে বন্দী । আর কারোর অমন শক্তিক্ষমতা থাকতে পারে না -- হতাশার শক্তিক্ষমতা --- তা সহ্য করবার, ওর ভালোবাসা আর শুশ্রুষা সহ্য করার ক্ষমতা । তাছাড়া, অন্য কারো সাথে আমি ওকে কল্পনাও করতে পারি না : আমাদের সকলের রয়েছে নিজস্ব কালো-দেবদূতের চোখ, অন্য লোকেদের দেবদূতদের নয়, --- অন্তত আমি তাইই মনে করি। আমি ওর আত্মার ভেতরে বাসা বেঁধেছিলুম, যেন তা ছিল এক ফাঁকা প্রাসাদ যাতে সবচেয়ে অযোগ্য লোক হিসাবে তুমিই তাতে থাকো : ব্যাস এইটুকুই । আহ! সত্যি বলতে কি আমি ওর ওপর শোচনীয়ভাবে নির্ভর করতুম । কিন্তু আমার নিষ্প্রভ, আমার ভিতু অস্তিত্ব থেকে ও কিই বা চাইতো ? ও তো আমার উৎকর্ষসাধন করতে পারতো না, যদিও ও কখনও আমাকে মেরে ফেলার ব্যবস্হা করতে পারেনি ! আমি এমন ভেঙে পড়ি আর হতাশ হই : অনেকসময়ে আমি ওকে বলি: “আমি তোমাকে বুঝতে পারি।” ও তাতে কেবল কাঁধ নাচায় ।
“আর তাই আমার হৃদয়ের বেদনা বাড়তেই থাকলো, আর আমি দেখলুম যে বেশি করে ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছি -- আর সবাই তা হয়তো দেখতে পেয়েছে, নিশ্চয়ই, আমি যদি এতোটা অবজ্ঞেয় না হতুম তাহলে কেউই আর আমার দিকে তাকিয়ে দেখতো না ! আর তবু আমি ওর অনুরাগের জন্যে আকুল কামনা করেছি...ওর চুমুগুলো আর ওর বন্ধুত্বের আলিঙ্গন ছিল স্বর্গীয়-- অন্ধকার স্বর্গ, যার মধ্যে আমি প্রবেশ করতে পারতুম, আর যেখানে আমি চাইতুম আমাকে রেখে দেয়া হোক -- গরিব, বধির, বোবা, এবং অন্ধ । আমি ইতিমধ্যে ওর ওপর নির্ভর করা আরম্ভ করেছিলুম । এবং আমি কল্পনা করতুম যে আমরা দুজন সুখী বালক দুঃখের স্বর্গোদ্যানে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি । আমাদের মধ্যে ছিল চরম সামঞ্জস্য । গভীর সমবেদনায়, আমরা পাশাপাশি খেটেছি । কিন্তু তারপর, এক ছিঁড়েফেলা আলিঙ্গনের শেষে, ও বলে উঠবে : “কতো মজার মনে হবে এই সমস্ত কাণ্ড, যা তুমি সহ্য করেছো, যখন আমি আর এখানে থাকবো না । যখন তুমি তোমার কাঁধ ঘিরে আমার বাহু অনুভব করবে না, তোমার তলায় আমার হৃদয়কেও পাবে না, তোমার চোখের ওপর আমার এই মুখ । কেননা একদিন আমাকে চলে যেতে হবে, অনেক দূরে । তাছাড়া, অন্যদেরও তো আমার সহচর্যের প্রয়োজন : সেই জন্যেই আমি এখানে রয়েছি, যদিও আমি সত্যিই তা চাই না...প্রিয় হৃদয়…”আর সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে অনুভব করতে পারি, ও চলে যাবার পর, ভয়ে বিহ্বল, ভয়ঙ্কর কালোগহ্বরে তলিয়ে যাওয়া : মৃত্যুর দিকে । আমি ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালুম যে ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না । এবং ও প্রতিজ্ঞা করলো, কুড়িবার ; প্রেমিকের মতন প্রতিজ্ঞা করলো । ব্যাপারটা যেন ওকে বলা আমার এই কথার মতন অর্থহীন “আমি তোমায় বুঝতে পারছি”।
“ওহ, আমি কখনও ওর সম্পর্কে ঈর্ষান্বিত হইনি । ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না, আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত । কিই বা ও করবে ? কোনো লোককেই ও চেনে না ; ও কোনও কাজও করতে পারবে না । ও ঘুমে-হাঁটা মানুষের মতন বাঁচতে চায় । ওর দয়া আর বদান্যতা কি বাস্তব জগতে ওকে ঠাঁই দেবে ? এমন মুহূর্তও আসে যখন আমি ভুলে যাই যে কোনও জঘন্য নোংরামিতে আমি জড়িয়ে পড়েছি : ও আমাকে শক্তি যোগাবে, আমরা দেশান্তরে যাবো, মরুভূমিতে শিকার করতে যাবো, অচেনা শহরের পথের ধারে ঘুমোবো, পিছুটানহীন আর মজায় । কিংবা হয়তো কোনোদিন জেগে উঠলুম আর -- ওর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা যাবতীয় আইনকানুন ও নীতি-নৈতিকতায় বদল ঘটিয়ে ফেলেছে, -- কিন্তু জগতসংসার ঠিক আগেকার মতনই রয়ে যাবে আর আমাকে রেখে যাবে আমার আকাঙ্খা আর আমার আনন্দ আর আমার উদ্বেগহীনতায়।
ওহ! অভিযানের সেই বিস্ময়কর জগৎ যা আমরা বাচ্চাদের বইতে পেতুম -- তুমি কি সেই জগৎ আমাকে দেবে না ? আমি অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, আমি একখানা পুরস্কারের যোগ্যতা রাখি। ওর তা নেই । আমি সত্যিই জানি না ও ঠিক কী চায় । ও বলে যে ওর রয়েছে নানাবিধ আশা এবং পশ্চাত্তাপ : কিন্তু সেসব ব্যাপার নিয়ে আমার কিছুই করার নেই । ও কি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা কয় ? আমারও উচিত ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলা । আমি অতলের তলানিতে, আর আমি ভুলে গেছি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয় ।
“মনে করো ও আমাকে নিজের দঃখকষ্ট ব্যাখ্যা করলো, আমি কি তা ওর ঠাট্টা-ইয়ার্কি এবং অপমানের চেয়ে ভালো করে বুঝতে পারবো ? ও আমাকে আক্রমণ করে, ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে লজ্জায় ফেলার জন্য সেইসব ব্যাপার যা আমার কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিয়ে বকে যায়, আর তারপর আমি যখন কাঁদি তখন ক্ষেপে যায়।
“-- তুমি কি ওই সৌম্যকাক্তি যুবকটিকে দেখতে পাচ্ছো সুন্দর, শান্তিপূর্ণ বাড়িটায় ঢুকছে? ওর নাম দুভাল, দুফো, আরমান্দ, মরিস, যা তুমি মনে করো। ওখানে এক মহিলা আছেন যিনি ওই অশুভ প্রাণীটাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়েছেন : উনি মারা গেলেন। আমি নিশ্চিত উনি এখন স্বর্গবাসী একজন সন্ত । তুমি আমাকে সেইভাবেই খুন করবে যেভাবে ও ওই মহিলাকে খুন করেছে । যাদের রয়েছে পরার্থবাদী হৃদয় তাদের এটাই ভবিতব্য…”। হে প্রিয় ! এমনও দিনকাল ছিল যখন ওর মনে হতো উদ্যমী মানুষেরা ওর গ্রটেস্ক উন্মাদনার খেলনা : ও তারপর ভয়ানকভাবে হাসতেই থাকবে, হাসতেই থাকবে ।---তারপর ও কমবয়সী মায়ের মতন বা বয়স্কা বোনের মতন অভিনয় করায় ফিরে যাবে । ও যদি অমন বুনো জিনিস না হতো, তাহলে আমরা বেঁচে যেতুম । কিন্তু ওর মধুরস্বভাবও সাঙ্ঘাতিক । আমি একজন কেনা-গোলাম। -- ওহ, আমি আমার চিন্তাক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি !
“কোনও দিন হয়তো ও অলৌকিকভাবে লোপাট হয়ে যাবে, কিন্তু আমাকে তা নিশ্চিত করে বলে যাওয়া দরকার, মানে আমি বলতে চাইছি ও যদি স্বর্গে বা অন্য কোথাও ফিরে যেতে চায়, যাতে আমি গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যে দেখতে পারি অক্ষতযোনি মেরির ঢঙে আমার সোহাগের খোকাটার স্বর্গারোহন ।
একটা নারকীয় গৃহস্হালী বটে !
দ্বিতীয় ডিলিরিয়াম : শব্দের অপরসায়ন
এবার আমার পালা । আমার উন্মাদনাগুলোর এক কাহিনি ।
অনেককাল যাবত আমি এই ভেবে দম্ভোক্তি করতুম যে সমস্ত সম্ভাব্য ভূদৃশ্যের আমি গুরু এবং আমি মনে করতুম যে আধুনিক তৈলচিত্র আর কবিতার মহান ব্যক্তিদের কাজগুলো হাস্যকর।
যা আমি পছন্দ করতুম তা হলো : কিম্ভুতকিমাকার তৈলচিত্র, চৌকাঠের মাথার ওপরের ছবি, মঞ্চের সজ্জা, কার্নিভালের পশ্চাতপট, সাইনবোর্ড, রঙচঙে ছাপা ; পুরোনোদিনের সাহিত্য, গির্জার লাতিন, ভুল বানানে ভরা যৌনপুস্তক, যে ধরণের উপন্যাস আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা পড়েন, পরিদের গল্প, বাচ্চাদের বই, পুরোনো অপেরা, ফালতু পুরোনো গান, দেশোয়ালি গানের ঠুনকো তাল ।
আমি ক্রুসেডের স্বপ্ন দেখতুম, এমন আবিষ্কারযাত্রায় বেরিয়েছি যা কেউ কখনও শোনেনি, ইতিহাসহীন গণরাজ্য, মুছে-ফেলা ধর্মযুদ্ধ, নৈতিকতায় বিপ্লব, মহাদেশ ও জনজাতির প্রসারণ : আমি সমস্ত রকমের ইন্দ্রজালে বিশ্বাস করতুম ।
আমি প্রতিটি স্বরবর্ণের রঙ আবিষ্কার করেছি ! --A কালো, E শাদা, I লাল,O নীল, U সবুজ।
---আমি আঙ্গিকের নিয়ম তেরি করেছি এবং প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের বিচলন, এবং আমি নিজের অন্তরজগত থেকে ছন্দ আবিষ্কারের দম্ভোক্তি করতুম, এমনই এক ধরণের কবিতা যাকে প্রতিটি ইন্দ্রিয়, এখন হোক বা পরে, স্বীকৃতি দেবে । এবং কেবল আমিই হবো তার অনুবাদক।
এটা আমি অনুসন্ধান হিসাবে আরম্ভ করেছিলুম । আমি নৈঃশব্দ আর রাতকে শব্দে পরিবর্তিত করে দিয়েছিলুম । যা উচ্চারণ করা যায় না, আমি তা লিখে ফেলতুম । আমি ঘুরন্ত পৃথিবীকে এক জায়গায় স্হির করে দিয়েছিলুম ।
----------------
ঝাঁকের থেকে দূরে, পাখিদের আর গ্রামের খুকিদের,
ওই পাতা-সবুজের ভেতরে আমি কী পান করেছিলুম
কচি বাদামগাছে ঘেরা
দুপুরের উষ্ণসবুজ কুয়াশায় ?
এই নতুন ওয়াজ নদী থেকে আমি কী পান করতে পারি
--জিভহীন গাছেরা, ফুলহীন ঘাসভূমি, অন্ধকার আকাশ !--
এই হলুদ কুমড়োখোসা থেকে পান করব, সেই কুটির থেকে দূরে
যা আমি ভালোবাসতুম ? একটু সোনালি চুমুক যার দরুন আমি ঘামছি।
আমাকে দেখে কোনো সরাইখানার সন্দিগ্ধ প্রতিনিধি মনে হতে পারতো ।
-- পরে, সন্ধ্যার দিকে, আকাশ মেঘেয় ভরা…
বনের ভেতর থেকে জলধারা ছুটে চলেছে বিশুদ্ধ বালিয়াড়িতে,
আর পুকুরের ওপরে স্বর্গীয় বাতাসে বরফের পুরু সর ;
তারপর আমি দেখতে পেলুম স্বর্ণ, আর ফোঁপালুম, কিন্তু পান করা হলো না।
গ্রীষ্মকালে, সকাল চারটের সময়ে
ভালোবাসার খোঁয়ারি তখনও থেকে গেছে…
ঝোপঝাড় ছড়িয়ে দিচ্ছে সুগন্ধ
রাতের পানভোজনোৎসবের
উজ্জ্বল নদীকন্যাদের ওইদিকে
সূর্যের পশ্চিমা কারখানার মধ্যে,
ছুতোরেরা তাড়াহুড়ো করছে -- শার্টের হাত গুটিয়ে --
এবার কাজ আরম্ভ হবে ।
কাজ শুরু হয়ে গেছে ।
আর ফাঁকা, শেওলা-ওপচানো পাথুরে জমিতে
তারা তাদের দামি জিনকাপড় মেলে ধরছে
যেখানে শহর
এঁকে দেবে এক ফোঁপরা আকাশ
ছবি আঁকা নিয়ে সেইসব মনোরম শখের চর্চাকারীদের জন্যে
যারা ব্যাবিলনের কোনো রাজার জন্যে পরিশ্রম করছে,
ভিনাস ! একটু সময়ের জন্য ছেড়ে চলে যাও
প্রেম-করিয়েদের উজ্বল হৃদয় ।
হে মেষপালকদের রানি !
শ্রমিকরা যেখানে জিরোচ্ছে
আর দুপুরের সমুদ্রে স্নান করছে
সেখানে নিয়ে যাও ফলের বিশুদ্ধতম মদ ।
--------------------------
আমার শব্দের অপরসায়নে পুরোনো দিনের কবিতার ক্ষয়ে-যাওয়া ধারণাগুলো গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল ।
আমি প্রাথমিক সন্মোহনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলুম : কারখানা দেখার বদলে আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম মসজিদ, দেবদূতদের ড্রামবাদকদল, আকাশের রাজপথে ঘোড়ার গাড়ি, ঝিলের জলের তলায় বৈঠকখানা ; দানবদের, আর রহস্যগুলো ; এক প্রমোদানুষ্ঠানের নামপত্র আমাকে শ্রদ্ধায় ভীত করেছিল ।
আর তাই আমি শব্দগুলোকে দৃষ্টিপ্রতিভায় বদলে দিয়ে আমার ঐন্দ্রজালিক কুতর্কগুলোকে ব্যাখ্যা করলুম !
শেষ পর্যন্ত আমার মগজের বিশৃঙ্খলাকে আমি পবিত্র বলে মনে করতে লাগলুম । গা এলিয়ে শুয়ে থাকতুম, জ্বরে গিলে খেয়ে ফেলছে শরীর : আমি জানোয়ারদের শান্তিময়তাকে হিংসে করতে লাগলুম -- গুটিপোকা, যারা দ্বিতীয় শৈশবের পাপহীনতাকে সুস্পষ্ট করে তোলে , গন্ধমুষিক, অক্ষতযোনি মেয়েদের তন্দ্রাভাব !
আমার মন বিষিয়ে উঠলো । আমি জগতসংসারকে গাথাসঙ্গীতের মতন কবিতায় বিদায় জানালুম :
সবচেয়ে উঁচু মিনার থেকে গাওয়া একটি গান
তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,
যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি
আমি বহুকাল অপেক্ষা করেছি
যা আমি ভুলে যেতে পারি ;
আর স্বর্গে রেখে দিতে পারি
আমার ভয় ও পশ্চাত্তাপ ।
এক অসুস্হ তৃষ্ণা
আমার শিরাগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে ।
তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,
যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি
তাই সবুজ মাঠ,
অনেক ছড়িয়ে পড়েছে, ফুলে ছেয়ে গেছে,
সুগন্ধ আর বুনোঝোপে
আর নোংরা পোকাদের
নিষ্ঠুর আওয়াজে ।
তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,
যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি
আমি মরুভূমিকে ভালোবাসতুম, পোড়া ফলবাগানকে, ক্লান্ত পুরোনো দোকান, গরম পানীয়। আমি নিজেকে দুর্গন্ধ গলির ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলুম, আর দুই চোখ বন্ধ করে আমি সূর্যের কাছে, যিনি আগুনের দেবতা, নিজেকে উৎসর্গ করলুম ।
“সেনাধিপতি, যদি তোমার বিদ্ধস্ত পাটাতনের ওপরে একটা কামানও টিকে থাকে, আমাদের ওপরে শুকনো মাটি দিয়ে গড়া গোলা চালাও । দামি দোকানগুলোর আয়নাগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দাও ! এবং বৈঠকঘরগুলো ! শহরের মুখে তারই ধ্বংসধুলো ঢুকিয়ে দাও । মরচে পড়ে যেতে দাও ছাদের সিংহমুখো নালিগোলোয় । পদ্মরাগমণির আগুনগুঁড়ো দিয়ে বন্ধ করে দাও মহিলাদের গোঁসাঘরগুলো….”
ওহ ! গ্রামের সরাইখানার পেচ্ছাপঘরের ছোট্ট মাছিটা, পচা আগাছার প্রেমে মশগুল, আলোর একটা রশ্মিতে ঝিমিয়ে পড়ে !
ক্ষুধা
আমি আমার হাড়ের ভেতরে কেবল খুঁজে পাই
পৃথিবীর মাটি আর পাথর খাবার স্বাদ ।
যখন আমি খাই, আমি বাতাস খেয়ে টিকে থাকি,
নুড়ি আর কয়লা আর আকরিক লোহা ।
পরিবর্তে, আমার ক্ষুধা । ক্ষুধা, খাওয়াও
খেতভরা ভূষি ।
যতো পারো যোগাড় করো সেই উজ্বল
বিষের আগাছা ।
একজন ভিখারির হাত দিয়ে ভাঙা পাথর খাও,
পুরোনো গির্জার দেয়ালের পাথর ;
নুড়িশিলা, বানভাসির শিশুরা,
কাদায় পড়ে থাকা রুটি ।
----------------------------------
ঝোপের পেছনে ডেকে উঠবে এক নেকড়ে
মোরগের মাংসখাবার উৎসবে
ঝলমলে পালকগুলো ছিঁড়ে :
ওরই মতন, আমি নিজেকে গিলে ফেলি ।
জড়ো করার জন্যে অপেক্ষা করে
ফল আর ঘাস তাদের সময় কাটায় ;
বেড়ায় যে মাকড়সা জাল বোনে
শুধু ফুল খায় ।
আমাকে ঘুমোতে দাও ! আমাকে সেদ্ধ হতে দাও
সলোমনের পূজাবেদির ওপরে ;
আমাকে শুষে নিতে দাও ছাতাপড়া মাটি,
আর বয়ে যেতে দাও কেন্দ্রনে ।
সব শেষে, হে যৌক্তিকতা, হে মহানন্দ, আমি আকাশ থেকে তার নীল সরিয়ে ফেলেছি যা আসলে অন্ধকার, আর আলোর প্রকৃতির সোনালি স্ফূলিঙ্গে বসবাস করেছি । আমার আনন্দের আতিশয্যে, আমি আমার মুখকে যতোটা পারি মজাদার আর আদিম করে তুলতে চেয়েছি:
ওটা খুঁজে পাওয়া গেছে ।
কী ? -- অনন্তকাল ।
ঘুরন্ত আলোয়
সমুদ্রের সূর্যে ।
হে আমার চিরকালীন আত্মা,
আকাঙ্খা আঁকড়ে ধরে থাকো
রাত হওয়া সত্ত্বেও
এবং আগুনের দিন ।
তোমাকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে
মানবের কঠোর সংগ্রাম থেকে
আর জগতসংসারের সকলরব প্রশংসা থেকে
তোমাকে উড়ে যেতে হবে যতোটা তুমি পারো….
--চিরকালের আশা নেই
নেই উথ্থানের অবকাশ ।
বিজ্ঞান আর ধৈর্য,
যাতনা অবশ্যম্ভাবী ।
তোমার অন্তরের আগুন,
মোলায়েম রেশম-অঙ্গার,
আমাদের সমস্ত কর্তব্য
কিন্তু কেউই তা মনে রাখে না ।
তা খুঁজে পাওয়া গেছে ।
কী ? অনন্তকাল ।
ঘুরন্ত আলোয়
সমুদ্রের সূর্যে ।
-------------------
আমি হয়ে উঠলুম নীতিকাহিনির অপেরা : আমি দেখলুম জগতসংসারে সকলেই আনন্দে দণ্ডপ্রাপ্ত। কর্মশক্তি প্রয়োগই জীবন নয় : তা কেবল ক্ষমতাকে বরবাদ করার একটা উপায়, স্নায়ুকে ধ্বংস করার নিমিত্তমাত্র । নৈতিকতা হলো মস্তিষ্কে ভরা জল।
আমার মনে হয়েছে যে প্রত্যেকেরই আরও বেশ কয়েকটা জীবন থাকা উচিত ছিল। ওই লোকটা জানে না ও কি করছে : ও একজন দেবদূত । ওই পরিবারটা কুকুর-বাচ্চাদের গাদাঘর । কয়েকজনের ক্ষেত্রে, আমি অনেকসময়ে তাদের কোনো এক অপরজীবন থেকে চেঁচিয়ে কথা বলেছি। -- ওই সূত্রেই আমি একটা শুয়োরকে পছন্দ করেছিলুম ।
উন্মাদনার একটিও মেধাবী যুক্তিতর্ক নয়, -- যে উন্মাদনাকে তালাচাবি দিয়ে আটক করা হয়, -- আমি কি ভুলে গেছি : আমি আবার তার কোটর দিয়ে যেতে পারি, পুরো প্রণালীটা আমার হৃদয়ে খোদাই করা আছে ।
তা আমার স্বাস্হ্যে প্রভাব ফেলেছিল । সামনেই যেন সন্ত্রাস । আমি বারবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তুম, যা এক লপ্তে অনেকদিন স্হায়ী হতো, আর যখন আমি জেগে উঠতুম, আমার দুঃখি স্বপ্নগুলো বজায় থাকতো । মারাত্মক ফসল তোলার জন্যে আমি ছিলুম তৈরি, আর আমার দুর্বলতা আমাকে জগতসংসারের বিপজ্জনক রাস্তার কিনার পর্যন্ত নিয়ে যেতো, সিমেরিয়ার সমুদ্রতীর পর্যন্ত, ঘুর্নিঝড় আর অন্ধকারের স্বর্গে ।
আমাকে ভ্রমণ করতে হতো, যাতে মগজে জড়ো হওয়া জাদুগুলো উবে যেতে পারে । সমুদ্রের ওপরে, যা আমি এমন ভালোবাসতুম যে তা যেন আমার অশুদ্ধতা ধুয়ে দেবে, আমি দেখলুম দয়াময় ক্রুশকাঠ ওপরে উঠে এলো । আমি ছিলুম রামধনু দ্বারা শাপিত । প্রকাশসৌষ্ঠব ছিল আমার শাস্তি, আমার কুরে-খাওয়া মনস্তাপ, আমার কীট : তারপর আমার জীবন শক্তিমত্তা এবং সৌন্দর্যের তুলনায় অনেকটাই বড়ো হয়ে উঠবে ।
আনন্দধারা ! তার মারাত্মক মিষ্টতার হুল আমাকে কাকডাকা ভোরে জাগিয়ে তুলবে, --রাত বারোটায়, যিশুর পুনরুথ্থানের মুহূর্তে, -- বিষণ্ণতম শহরে :
হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !
কোথায় আছে সেই নিখুঁত আত্মা ?
আমি শিখলুম ইন্দ্রজাল
আনন্দধারা, আমাদের সবাইকে সন্মোহিত করে।
আনন্দধারা তোমাকে, জীবনের জয়গান করো
যখনই ফরাসিদেশের কাক ডেকে উঠবে ।
এখন সমস্ত আকাঙ্খা বিদায় নিয়েছে :
আমার জীবনকে তা নিজের করে নিয়েছে ।
সেই সন্মোহন প্রভাবিত করেছে আমার হৃদয় ও আত্মা
আর প্রতিটি যোগ্যতাবিচারকে লণ্ডভণ্ড করেছে ।
হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !
আর, ওহ ! যেদিন তা মিলিয়ে যাবে
সেইদিনই হবে আমার মৃত্যুর দিন ।
হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !
----------------------
তা সবই শেষ হয়ে গেছে । আজকে, আমি জানি সৌন্দর্যকে কেমন করে উদযাপন করতে হয় ।
সেই অসাধ্যসাধন
আহ ! বালক হিসাবে আমার জীবন, প্রতিটি আবহাওয়ায় খোলা রাস্তার মতন ; আমি ছিলুম অস্বাভাবিকভাবে মিতাচারী, সবচেয়ে ভালো ভিখারির চেয়েও উদাসীন, কোনো দেশ না থাকার চেতনায় গর্বিত, বন্ধুহীন, তা যে কি বোকামি ছিল । -- আর আমি এখন তা উপলব্ধি করছি!
-- বুড়ো লোকগুলো যারা আদর করার সুযোগ ছাড়ে না তাদের অবিশ্বাস করার ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম, আমাদের নারীদের স্বাস্হের গায়ে আর নির্মলতায় পরগাছা, যখন কিনা আজকে নারীরা আমাদের থেকে আলাদা এক জাতি ।
যা কিছু আমি অবিশ্বাস করতুম সে ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম : কেননা আমি পালিয়ে যাচ্ছি!
আমি পালিয়ে যাচ্ছি !
বলছি বিশদে ।
এমনকি কালকেও, আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছি : “ঈশ্বর ! এখানে এই তলানিতে আমাদের মতন প্রচুর অভিশপ্ত রয়েছে ! তাদের সারিতে আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট দুর্দশায় ভুগেছি ! আমি ওদের সবাইকে চিনি । আমরা পরস্পরকে চিনতে পারি ; আমরা পরস্পরকে বিরক্ত করি । আমাদের কেউই পরার্থবাদীতার কথা শোনেনি । তবুও, আমরা মার্জিত ; জগতসংসারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ নিয়মানুগ ।” তা কি অপ্রত্যাশিত ? এই জগতসংসার ! ব্যবসাদারের দল, আর মূর্খেরা ! -- এখানে থাকায় কোনো অসন্মান নেই । -- কিন্তু নির্বাচিত লোকজন, তারা আমাদের কীভাবে আপ্যায়ন করবে ? কেননা তেমন লোকজনও তো আছে, খুশমেজাজ লোকজন, নকলভাবে নির্বাচিত, কেননা তাদের সান্নিধ্যে যাবার জন্যে আমাদের সাহসী ও বিনয়ী হতে হবে। ওরাই প্রকৃত নির্বাচিত । মোটেই কপটাচারী সন্ত নয়, ওরা !
যেহেতু দুই পয়সা দামের যুক্তিপূর্ণতা ফিরে পেয়েছি -- কেমন তাড়াতাড়ি তা চলে যায়! -- আমি দেখতে পাই যে আমার ঝঞ্ঝাটের উৎস হলো আগেই টের না পাওয়া যে এটা পাশ্চাত্য জগৎ । এগুলো পাশ্চাত্য জলাভূমি ! এমন নয় যে আলো ফিকে হয়ে গেছে, আঙ্গিক ক্ষয়াটে, কিংবা অগ্রগমন বিপথে চালিত...। ঠিক আছে ! প্রাচ্যের পতনের পর থেকে আমার মনের মধ্যে যে রদবদল ঘটেছে আমার মন এখন নিশ্চিতভাবে সেই সব নিষ্ঠুর ঘটনার মোকাবিলা করতে চায়...। আমার মনের সেটাই চাহিদা !
...আর সেখানেই আমার দুই পয়সা দামের যুক্তিবোধের সমাপ্তি ! নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মন, তা দাবি করছে যে আমি পাশ্চাত্যজগতেই থাকি । যেমনটা আমি চিরকাল চেয়েছি, আমি যদি এটা শেষ করে ফেলতে চাই তাহলে একে চুপ করিয়ে দিতে হবে ।
আমি আগে বলতুম, চুলোয় যাক শহিদদের করতল, শিল্পের যাবতীয় আলোকসঙ্কেত, আবিষ্কারকের গর্ববোধ, লুন্ঠনকারীর উত্তেজনা ; প্রাচ্যদেশে এবং মৌলিক, শাশ্বত জ্ঞানে আমার ফিরে যাবার কথা । কিন্তু এসবই নিঃসন্দেহে কলুষিত আলস্যের স্বপ্ন !
আর তবুও আধুনিক যন্ত্রণাবোধ থেকে পালাবার ইচ্ছে আমার ছিল না । কোরানের মিশ্রিত পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আমার গভীর কৌতূহল নেই। -- কিন্তু এই জ্ঞানে কি প্রকৃত পীড়ন নেই যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রদোষ থেকে, খ্রিস্টধর্ম, মানুষ নিজেকে মূর্খ প্রতিপন্ন করে চলেছে, যা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান তাকে প্রমাণ করতে চাইছে, বারবার প্রমাণ দেখিয়ে গর্বে বুক ফোলাচ্ছে, আর কেবল তা নিয়েই বেঁচে আছে ! এটা একরকমের সূক্ষ্ম, বোকা পীড়ন ; আর এটাই আমার আত্মিক অসংলগ্নতার উৎস । প্রকৃতি হয়তো এই সমস্ত ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত ! যিশুর সঙ্গেই জন্মেছিলেন প্রুধোম ।
তা কি এই জন্যে নয় যে আমরা কুহেলিকার চর্চা করি ! জোলো শাকসবজির সঙ্গে জ্বরকে গিলে ফেলি । এবং মাতলামি ! আর তামাক । আর অজ্ঞানতা ! আর অন্ধ ধর্মবিশ্বাস ! -- এই সমস্তকিছুই কি প্রাচ্যের জ্ঞান, আমাদের আসল পিতৃভূমি, তার দর্শন থেকে দূরে নয় ? আধুনিক জগতসংসার নিয়ে কিই বা করার আছে, যদি অমন বিষ আবিষ্কার হয় !
যাজকরা আর ধর্মোপদেশকরা বলবেন : নিশ্চয়ই । কিন্তু তুমি তো আদম আর ইভের নন্দনকাননের প্রসঙ্গ তুলছো । প্রাচ্য জাতিদের অতীত ইতিহাসে তোমার জন্য কিচ্ছু নেই...। সে কথা সত্যি । আমি নন্দনকাননের কথাই বলতে চাইছি ! প্রাচীন জাতিদের বিশুদ্ধতা কেমন করেই বা আমার স্বপ্নকে প্রভাবিত করবে ?
দার্শনিকরা বলবেন : জগতসংসারের কোনো বয়স নেই । মানবতা স্হান থেকে স্হানান্তরে যায়, ব্যাস । তুমি একজন পাশ্চাত্য মানুষ, কিন্তু তুমি তোমার নিজস্ব প্রাচ্যে বসবাসের জন্য স্বাধীন, যতো পুরোনো তুমি চাও ততোই, -- আর সেখানে তুমি যেমন ইচ্ছে থাকতে চাও । হেরো হয়ে যেও না । দার্শনিকগণ, আপনারা পাশ্চাত্য জগতের পাকাপাকি অংশ !
মন, সাবধান হও । উত্তরণের পেছনে পাগলের মতন ছুটো না । নিজেকে শিক্ষিত করো! --আহ!
বিজ্ঞান আমাদের থেকে কখনও এগিয়ে থাকে না !
--কিন্তু আমি দেখি আমার মন ঘুমিয়ে পড়েছে ।
এই মুহূর্ত থেকে যদি তা পূর্ণসতর্ক থাকে, আমরা দ্রুত সত্যকে পাবো, যা হয়তো এখনই ফোঁপাতে থাকা দেবদূতদের দিয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে !....-- যদি তা এই মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ণসতর্ক ছিল, তাহলে, অনেককাল আগেই, আমি তা নীচ প্রবৃত্তির কাছে সোপর্দ করতুম না !...--যদি তা চিরটাকাল পূর্ণসতর্ক থাকতো, আমি প্রজ্ঞায় ভাসতুম!...
হে বিশুদ্ধতা ! বিশুদ্ধতা !
এই জাগরণের মুহুর্তে, আমার ঘটে গেল বিশুদ্ধতার দৃষ্টিপ্রতিভা ! মনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোই !
কী যে এক ঠুঁটো দুর্ভাগ্য !
সৌদামিনী
----------------
মানুষের শ্রম ! সেই বিস্ফোরণ আমার অতলকে সময়ে-সময়ে আলোকিত করে।
“জ্ঞান আহরনের পথে : কোনো ব্যাপারই আত্মশ্লাঘা নয়!” চেঁচিয়ে বলে ওঠেন আধুনিক ধর্মপ্রচারকদল, যার অর্থ সব্বাই । আর তবুও বজ্জাত ও অলসদের চাপ গিয়ে পড়ে বাদবাকিদের হৃদয়ের ওপরে….। আহ ! তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি ওইখানে চলুন ; রাতের ওই পারে...ভবিষ্যতের সেই পুরস্কার, সেই শাশ্বত পুরস্কার...আমরা কি তা থেকে নিষ্কৃতি পাবো?
---এর থেকে বেশি আমি কিই বা করতে পারি ? শ্রমের কথা জানি ; এবং বিজ্ঞান বড়োই মন্হর। প্রার্থনা দ্রুতগামী আর আলোকমালার গর্জন...আমি তা ভালো করে জানি। ব্যাপারটা খুবই সহজ, আর আবহাওয়া বেশ তপ্ত ; আমাকে ছাড়াই তোমাদের চলে যাবে । আমার রয়েছে কর্তব্য ; একে একপাশে সরিয়ে রাখতে, আমি গর্ববোধ করবো. যেমন অন্যেরা করেছে ।
আমার জীবন নিঃশেষিত । ঠিকই, চলো ভান করা যাক, আমরা কোনো কাজই করবো না ! ওহ ! দুঃখদায়ক ! আর আমরা বেঁচে থাকবো, আর নিজেদের মনোরঞ্জন করবো, দানবিক প্রেম আর খেয়ালি জগতের স্বপ্ন দেখবো, পৃথিবীর আদল-আদরা নিয়ে অভিযোগ আর ঝগড়া করবো, দড়াবাজিকর, ভিখারি, শিল্পী, ডাকাত, -- যাজক ! আমার হাসপাতালের বিছানায়, ধুপকাঠির সুগন্ধ তীব্রভাবে আমার কাছে ফিরে এলো ; পবিত্র সৌরভের অভিভাবক, আত্মস্বীকৃতিকারী, শহিদ...।
শৈশবের মলিন শিক্ষা সেখানে আমি চিনতে পারি । তারপর কী !...কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছোও: আমি কুড়িবছর পালন করবো, অন্য সকলে যদি তা করে...।
না ! না ! এখন আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াচ্ছি ! আমার গর্ববোধের তুলনায় শ্রমকে মামুলি মনে হয় : জগতসংসারের কাছে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়াটা আমার শাস্তির পক্ষে যৎসামান্য হবে। শেষ মুহূর্তে আমি আক্রমণ করব, একবার ডানদিকে, আরেকবার বাঁদিকে....।
---ওহ ! -- বেচারা প্রিয় আত্মা, তাহলে অমরত্ব হয়তো হাতছাড়া হবে না !
সকাল
আমার কি একসময় তেমন যৌবন ছিল না যা মনোরম, বীরোচিত, কিংবদন্তিপ্রতিম, যা সোনার কাগজে লিখে ফেলা যায় ? -- আমি ছিলুম খুবই ভাগ্যবান ! কোন সে অপরাধ, কোন ভুলের কারণে আমার ওপর বর্তেছে বর্তমান দুর্বলতা ? তোমরা যারা মনে করো যে জানোয়াররাও দুঃখে ফোঁপায়, অসুস্হরা বিষাদগ্রস্ত হয়, মৃতেরা খারাপ স্বপ্ন দ্যাখে, এবার আমার পতনের সঙ্গে আমার ঘুমের সম্পর্ক খোঁজো । যে ভিখারিটা পাখির মতন এবং প্রভুর বন্দনাগান গায়, আমি নিজেকে তার চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না । কীভাবে কথা কইতে হয় তা আমি আর জানি না !
অথচ তবু, আজকে, আমার মনে হয় এই নরকের হিসাব আমি শেষ করে ফেলেছি । আর তা নরকই ছিল : সেই পুরোনোটা, যার সিংহদরোজা খুলে দিয়েছিল মানবপুত্র ।
সেই একই মরুভূমি থেকে, সেই একই আকাশপানে, আমার ক্লান্ত চোখ রূপালি নক্ষত্রের দিকে সবসময় চেয়ে থাকে, সব সময়ের জন্যে ; কিন্তু সেই তিন জ্ঞানী মানুষ একেবারও নিজেদের জায়গা থেকে নড়াচড়া করেন না, জীবনের মহারাজারা, হৃদয়, আত্মা, মন । আমরা যখন যাবো, পাহাড়ের ওপর আর সমুদ্রের তীরে, নতুন শ্রমের, নতুন জ্ঞানের জন্মের গুণগান করার জন্যে, অত্যাচারী এবং দানবরা পালাবে , কুসংস্কারের সমাপ্তি ঘটবে, -- আমরাই হবো প্রথম ভক্ত ! -- পৃথিবীর মাটিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব !
স্বর্গসমূহের গান, রাষ্ট্রদের অগ্রগমন ! আমরা কেনা-গোলাম , জীবনকে অভিশাপ দেয়া আমাদের উচিত নয় !
বিদায়
হেমন্ত এসে গেছে ! -- আমরা যদি দৈব উজ্বলতা অনুসন্ধানের জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাহলে চিরকালীন সূর্যের জন্যে কেনই বা দুঃখপ্রকাশ করা , -- ঋতুবদলের সঙ্গে যাদের মৃত্যু হয় তাদের থেকে বহু দূরে ।
হেমন্ত । আমাদের নৌকা, ঝুলন্ত কুয়াশা থেকে উঠে এসেছে, বাঁক নেয় দারিদ্রের বন্দরের দিকে, দানবিক শহর, তার আকাশ আগুন আর কাদায় নোংরা । আহ ! সেইসব কটুগন্ধ কাঁথা, বৃষ্টিতে ভেজা রুটি, মাতলামি, আর হাজার প্রেম যা আমাকে ক্রুশকাঠে বিঁধেছে ! লক্ষকোটি মৃত আত্মা আর দেহের পিশাচিনী রানির দিন কি কখনও ফুরোবে না, আর কবেই বা তাদের সবায়ের বিচার হবে ! আমি নিজেকে আবার দেখতে পাই, নোংরায় আর রোগে আমার গায়ের চামড়া ক্ষয়ে গিয়েছে, মাথার চুলে আর বগলে পোকারা কিলবিল করছে, আর তাদের চেয়েও বড়ো-বড়ো পোকা চরে বেড়াচ্ছে আমার হৃদয়ে, আয়ূহীন, হৃদয়হীন, অচেনা আকারে ছেয়ে ফেলেছে...। আমি সেখানে অনায়াসে মরে যেতে পারতুম...। কি ভয়ানক স্মৃতি ! দারিদ্র্যকে আমি খুবই ঘেন্না করি।
আর শীতকালকে আমি ভীষণ ভয় পাই কেননা তা বড়োই আরামদায়ক !
---অনেকসময়ে আমি আকাশে দেখতে পাই বালিছড়ানো সীমাহীন তীর শাদা উদ্দীপনাময় রাষ্ট্রে ছেয়ে গেছে । একটা সোনালি জাহাজ, আমার ওপরদিকে, সকালের হাওয়ায় নানা রঙের নিশান ওড়াচ্ছে । প্রতিটি ভোজনোৎসব, প্রতিটি বিজয়, প্রতিটি দৃশ্যকাব্যের আমি ছিলুম স্রষ্টা । নতুন ফুল, নতুন গাছপালা, নতুন মাংস, নতুন ভাষা আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলুম আমি । আমি ভেবেছিলুম আমি অর্জন করেছি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ।
হাঃ ! আমাকে আমার কল্পনা আর আমার স্মৃতিকে গোর দিতে হবে ! শিল্পী আর গল্পকার হিসাবে জমকালো কর্মজীবনের কেমনতর সমাপ্তি!
আমি ! নিজেকে ম্যাজিশিয়ান, দেবদূত, নৈতিকতার বাঁধন থেকে মুক্ত বলে মনে করেছিলুম ।
আমাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে যাতে চাষের জমির প্রতি কৃতজ্ঞতা শোধ করতে পারি, বাহুতে মুড়ে নিতে পারি গ্রন্হিল বাস্তবতা ! একজন চাষি !
আমি কি প্রতারিত ? পরার্থবাদিতা কি হয়ে উঠবে মৃত্যুর বোন, আমার জন্যে ?
ঠিক আছে, মিথ্যা আশ্রয় করে বেঁচে থাকার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নেবো। আর তাইই শেষ ।
কিন্তু বন্ধুত্বের একটাও হাত নেই ! আর কোথায়ই বা আমি সাহায্য খুঁজবো ?
¯¯¯¯¯¯¯¯
সত্যি, নতুন যুগ রূঢ় ছাড়া আর কিছুই নয় ।
কেননা আমি বলতে পারি যে আমি একটা বিজয় পেয়েছি ; দাঁতের ওপর দাঁত চেপে, নরকের আগুনের ফোঁসফোঁসানি, দুর্গন্ধিত দীর্ঘশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে । আমার রাক্ষুসে স্মৃতি মিলিয়ে যাচ্ছে।
বিদায় নিচ্ছে আমার শেষ আকাঙ্খাগুলো, -- ভিখারিদের, ডাকাতদের, মৃত্যুর বন্ধুদের, যে জগত পাশ দিয়ে চলে গেছে, তার সম্পর্কে ঈর্ষা । --- অভিশপ্ত আত্মারা, যদি আমি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারতুম !
চরম আধুনিক হওয়া দরকার ।
ধন্যবাদোৎসবের স্তবগানকে গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই : একবার যে ধাপে পা রেখেছো তা ধরে রাখো । এক দুঃসহ রাত ! আমার মুখের ওপরে শুকনো রক্তের ধোঁয়া, আর আমার পেছনদিকে ওই ছোট্ট বীভৎস গাছ ছাড়া আর কিছু নেই !...মানুষের সংগ্রামের মতনই আত্মার জন্য সংগ্রামও পাশবিক ; কিন্তু বিচারের আনন্দদর্শন কেবল ঈশ্বরের একার ।
তবু এটাই রাত্রিকালের জাগ্রদবস্হা । চলো আমরা নতুন শক্তিক্ষমতাকে, আর প্রকৃত প্রেমপরায়ণতাকে মেনে নিই । এবং সকালে, দীপ্তমান ধৈর্যকে বর্ম করে, আমরা মহিমান্বয়ের শহরগুলোয় প্রবেশ করবো ।
আমি কেন বন্ধুত্বের হাতের কথা বলেছিলুম ! আমার সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হলো যে মিথ্যায় ভরা পুরোনো ভালোবাসা আমি হেসে উড়িয়ে দিতে পারি, আর অমন প্রতারণাভরা যুগলকে কলঙ্কে দেগে দিতে পারি, -- সেখানে আমি নারীদের নরকের অভিজ্ঞতাও পেয়েছি ; -- আর এবার আমি একই দেহ ও একই আত্মায় সত্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবো ।
[ রচনাকাল : এপ্রিল-আগস্ট, ১৮৭৩ ]
[ অনুবাদ : ২০১৯ ]
Jean Arthur Rimbaud : ইল্যুমিনেশানস -- অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী
Jean Arthur Rimbaud : ইল্যুমিনেশানস
অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
বানভাসির পর
ইল্যুমিনেশান ১
বানভাসির ধারনা শেষ হবার পরই, একটা খোরগোশ গোরুর গোয়ালে আর দুলতেথাকা ফুলগাছের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে, মাকড়সার জালের ভেতর দিয়ে রামধনুকে প্রার্থনা শোনালো।
ওহ ! যে দামি পাথরগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, -- ফুলগুলো নিজেদের চারিধারে তাকিয়ে দেখছিল। নোংরা রাজপথে দোকান বসেছিল, তারা নৌকোগুলোকে টেনে নিয়ে গেল পরতে-পরতে ফুলে ওঠা সমুদ্রের ঢেউয়ে ঠিক যেমন পুরোনো ছবিগুলোতে দেখা যায় ।
যে নীলদাড়ি লোকটা নিজের বউগুলোকে একের পর এক মেরে ফেলতো, তার বাড়িতে রক্ত বইতে লাগল --- সারকাসের কসাইখানায় ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা শাদা করে তুলছিল জানালাগুলোকে। রক্ত আর দুধ বইছিল ।
ভোঁদোড়েরা গড়েছিল । শুঁড়িখানায় কফির পেয়ালায় উঠছিল ধোঁয়া ।
চারাগাছের বিশাল কাচঘরে জলফোঁটা ঝরছিল তখনও, সুন্দর ছবিগুলোর দিকে চেয়েছিল শোকাতুর শিশুরা ।
দরোজার পাল্লার আওয়াজ, আর, গ্রামের সবুজে, এক খোকা দুই হাত নাড়ালো, বেগবান ঝর্ণার তলায়, সব জায়গাকার ঘণ্টাঘরের হাওয়ামোরগ আর আবহাওয়া নির্দেশকগুলো তা টের পাচ্ছিল।
ম্যাডাম অমুক আল্পস পাহাড়ে একটা পিয়ানো বসালেন । গির্জার একশো হাজার বেদির ওপরে উদযাপন করা হচ্ছিল খ্রিস্টের নৈশভোজনোৎসব-পর্ব আর প্রথম ধর্মসংস্কার ।
চলে গেল মরুযাত্রীদল । আর বরফ ও মেরুরাত্রির বিশৃঙ্খলায় তৈরি করা হলো দীপ্তিশীল হোটেল।
তারপর থেকে, সুগন্ধগুল্মের মরুভূমিতে শেয়ালের ডাক শুনতে পেল চাঁদ -- আর ফলবাগানে কাঠের জুতো পরে চারণকবিতাদের অসন্তুষ্ট বিড়বিড়ানি । তারপর, থইথই বেগনি জঙ্গলে, বনানীর উপদেবী আমাকে বললো যে এটা বসন্তঋতু ।
ঝিলপুকুর, ফুলে ওঠো : ফেনায়িত হও, সাঁকোর ওপর আর গাছের তলা দিয়ে গড়িয়ে চলে যাও: -- কালো ঝালর আর অবয়ব -- বজ্র ও বিদ্যুৎ উঠে দাঁড়াও আর ঝাঁপাও : -- জল এবং দুঃখ ওঠো আর আরেকবার বানভাসিকে তুলে আনো ।
জল নেমে গিয়েছিল বলে -- ওহ, দামি পাথরগুলো নিজেরা চাপা পড়ে গিয়েছিল আর ফুটে ওঠা ফুলের দল ! -- তা বড়োই ক্লান্তিকর ! আর সেই ডাকিনী রানি, যিনি পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি পাত্রে আগুন জ্বালান, কখনও বলবেন না তিনি যা জানেন, আর আমরা কোন ব্যাপারে অবিদিত।
শৈশব
ইল্যুমিনেশান ২
১
পূর্বপুরুষহীন কিংবা দরবারহীন প্রতিমা, কালোচোখ আর হলুদ-চুল, কিংবদন্তির চেয়েও সম্ভ্রান্ত, মেক্সিকোর কিংবা ফ্লানডার্সের : তার দেশ দুর্বিনীত সোনালি আর সবুজ, ঢেউয়ের নামে আঁকা সমুদ্রতীরকে পাক দেয়, জলপোতহীন, যাদের নাম ভয়ানকভাবে গ্রিক, স্লাভ, কেল্টভাষী।
জঙ্গলের শেষে -- স্বপ্নেদেখা রুনুঝুনু ফুল : ফুটে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে -- কমলারঙা ঠোঁটের মেয়েটি, পশুচারণভূমি থেকে ছলকানো বানভাসির পরিষ্কার জলে হাঁটুমুড়ে, নগ্নতা ছায়ায় ঢাকা, তির্যক রামধনুর পোশাক পরানো ; ফুলের দল এবং সমুদ্র ।
সমুদ্রের ধারে ছাদের ওপরে যে নারীরা পায়চারি করেন : অনেকে খুকি আর বিশালদেহ, তামাটে শ্যাওলায় অসাধারণ কৃষ্ণাঙ্গী, তরুবীথিকার উর্বর মাটিতে সাজানো মণিরত্ন এবং ছোটোখাটো গলাতুষার বাগান -- তরুণী মায়েরা আর বড়োদিদিরা যাদের মুখময় তীর্থযাত্রার প্রলেপ, প্রজাপীড়ক সাজপোশাকে নবাবজাদীরা, রাজকন্যারা, ছোটোছোটো বিদেশী মেয়েরা আর সুশীল অসুখী জনসাধারণ ।
বড়োই একঘে্য়ে, ‘প্রিয়তম শরীর’ এবং ‘মহার্ঘ হৃদয়’ !
২
এ তো সে, গোলাপঝাড়ের পেছনে, মৃত খুকিটা । -- কম বয়সী মা, মারা গেছে, সিঁড়ি দিয়ে নামে। -- খুড়তুতো ভাইয়ের গাড়ি বালির ওপরে খোনাস্বর আওয়াজ তোলে । -- ছোট্ট ভাই ( সে ভারতবর্ষে থাকে ! ) সেখানে, সূর্যাস্তের সামনে, কারনেশান ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে । দেয়ালের ফুলে ছেয়ে থাকা বাঁধের ওপরে বুড়োদের সোজা করে কবর দেয়া হয়েছে ।
সেনাপতির বাড়ির চারিপাশ ঘিরে আছে সোনালি পাতার ঝাড় । ওরা সবাই দক্ষিণে । -- তুমি লালরঙা পথ ধরে ফাঁকা সরাইখানায় পৌঁছে যাও । জমিদারের গ্রামের বাড়ি বিক্রি হবে : খড়খড়িগুলো ঢিলেঢালা । -- পাদরিসাহেব চাবি নিয়ে গির্জায় চলে গিয়ে থাকবেন । -- পার্কের কাছাকাছি পাহারাদারদের কুটিরগুলো ভাড়া দেয়া হয়নি । বেড়াগুলো এতো উঁচু যে তুমি গাছের মাথার ঘষটানি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না ।
চারণভূমিগুলো উঠে গেছে মুরগিবর্জিত গ্রামগুলোর দিকে, কামারের নেহাইও নেই । জলকপাট ওপরে তোলা । হে বনজঙ্গলের ক্রুশকাঠ আর হাওয়াকল, দ্বীপপূঞ্জ আর ধোঁয়া-চিমনির সারি ।
ম্যাজিক ফুলেদের গূঞ্জন । ঢালু জায়গা ওকে কোল দিয়েছিল । চারিদিকে ঘুরছিল রূপকথার বাহারঅলা প্রাণী । শাশ্বত উষ্ণ চোখের জলে তৈরি মেঘেরা জড়ো হচ্ছিল ফাঁকা সমুদ্রের ওপরে।
৩
বনের ভেতরে একটা পাখি রয়েছে, তার গান তোমাকে থামিয়ে দেয় আর আরক্তিম করে তোলে।
একটা দেয়ালঘড়ি রয়েছে যা কখনও বাজে না ।
একটা গর্তে রয়েছে শাদা প্রাণীর বাসা ।
একটা গির্জা রয়েছে যা নামছে, আর একটা ঝিল যা ওপরে উঠছে ।
বেড়ার ঝাড়ের আড়ালে রাখা রয়েছে রাঙা ফিতেয় সাজানো ছোট্ট ঘোড়ারগাড়ি, কিংবা গলি ধরে দৌড়োচ্ছে,
বনের আড়াল থেকে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে পোশাকপরা ছোটো অভিনেতাদের দল ।
শেষ পর্যন্ত, কেউ তো রয়েছে, যখন তুমি ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত, যে তোমাকে তাড়িয়ে দিলো।
৪
ছাদের ওপরে প্রার্থনারত আমিই সেই সন্ত --- যখন শান্তিময় জানোয়ারেরা প্যালেসটাইনের সমুদ্র পর্যন্ত চরে ঘাস খেতে গেছে ।
অন্ধকার আরামকেদারায় আমিই সেই পণ্ডিত । গ্রন্হাগারের জানালায় গাছের ডালপালা আর বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে ।
বেঁটে গাছের বনের ভেতর দিয়ে যে পথ দেখা যাচ্ছে, আমিই তার পর্যটক : আমার পদধ্বনিকে নিঃশব্দ করে দিচ্ছে খোলা জলকপাটের গর্জন । আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখতে থাকি সূর্যাস্তের দুঃখি সোনালি প্রক্ষালন ।
আমি হয়তো সেই বালক যে সমুদ্রে ভেসে-যাওয়া জেটির ওপরে রয়ে গেছে, চাষিবাড়ির ছোটো ছেলে যে গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছে তার চুলের ঝুঁটি আকাশ ছুঁয়েছে ।
পথগুলো অসমতল । ছোটো ঢিবিগুলো ঝাঁকড়াগাছে ঢাকা । হাওয়া নিশ্চল । পাখিগুলো আর ঝর্ণা আর কতো দূরে ! সামনে সেটাই হয়তো পৃথিবীর শেষপ্রান্ত ।
৫
মাটির অনেক গভীরে -- রেখায় নকশাকাটা, চুনকামকরা, শেষের দিকের এই স্মৃতিস্তম্ভ ওরা আমায় ভাড়া দিক ।
টেবিলে হেলে পড়ি, লন্ঠনের আলো ঝলমল করে তুলেছে যে পত্রিকাগুলো সেইগুলো আমি বোকার মতন দ্বিতীয়বার পড়ি, অথচ বইগুলোতে আর আগ্রহ নেই ।
মাটির তলায় আমার বাসার ওপরে অনেক দূরে বাড়িঘরের ভিতপোঁতা, কুহেলিকা জড়ো হয়। মাটির রঙ লাল কিংবা কালো । দানবিক শহর, শেষহীন রাত !
তলায় রয়েছে নর্দমা । পাশটা কেবল কাচের পাত্রের মতন পুরু । হয়তো স্হলবেষ্টিত আশমানি উপসাগর , আগুনের কুয়ো, উপসাগর । হয়তো এই স্তরে চাঁদ আর ধুমকেতু, সমুদ্র আর কিংবদন্তির সাক্ষাৎ ঘটে ।
তিক্ত মানসিকতার সময়ে আমি ধাতুর, নীলকান্তমণির গোলকের কল্পনা করি । আমি নৈঃশব্দের প্রভূ । ধনুকের মতন ছাদের কোনায় কেনই বা কাচফোকরের মতন দেখতে জায়গাটার আলো ফিকে হয়ে আসবে ?
গল্প
ইল্যুমিনেশান ৩
মামুলি বদান্যতায় নিজেকে একবার দিয়ে ফেলা দক্ষতা সম্পর্কে একজন রাজপুত্র অত্যন্ত কূপিত ছিল । ভবিষ্যতে প্রেমের যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটবে তা ও দেখতে পাচ্ছিল, আর সন্দেহ করছিল যে ওর স্ত্রীদের রয়েছে বিলাসদ্রব্য আর আকাশের দেয়া সন্তোষ-উৎপাদন বাড়িয়ে তোলার চেয়েও বেশি চাহিদা । ও সত্য ঘটনা জানতে চাইছিল, আকাঙ্খা আর বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়োজন জানতে চাইছিল । তা স্বধর্ম থেকে বিপথগমন হোক বা নাহোক ও জানতে চাইছিল। ওর অন্তত ছিল যথেষ্ট জাগতিক ক্ষমতা ।
প্রতিটি নারী যে ওকে জানতো, খুন হয়ে যেতো গুপ্তঘাতকদের হাতে । সৌন্দর্যের বাগানে কি যে ব্যাপক ধ্বংস ! খাঁড়ার তলায় তারা ওকে আশীর্বাদ করেছিল । ও আর নতুন করে কাউকে চায়নি । --সেই নারীরা আবার দেখা দিলো ।
যারা ওকে অনুসরণ করেছিল তাদের, শিকারের পর কিংবা মদে মাতাল হয়ে, সবাইকে ও হত্যা করল । -- সবাই ওকে অনুসরণ করা বজায় রাখল ।
বিরল প্রাণীদের গলা কেটে নিজেকে ও আনন্দ দিতো । প্রাসাদগুলোয় ও আগুন ধরিয়ে দিলো। জনসাধারণের ওপর দিয়ে গিয়ে তাদের কুটিকুটি করে ফেললো । -- জনসাধারণ, সোনালি ছাদ, সুন্দর প্রাণীরা তবু বেঁচে রইলো ।
কেউ কি ধ্বংসে খুঁজে পায় চরমানন্দ, নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে নিজেকে আবার তরুণ করে তুলতে পারে ? জনসাধারণ টুঁ শব্দও করেনি । কেউ ওর দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতে এগিয়ে যায়নি। এক সন্ধ্যায় ও গর্বে ঘোড়ায় বসে তাকে ছোটাচ্ছিল । এক ডাকিনী দেখা দিলো, অনির্বচনীয়া এমনকি লজ্জাময়ী সুন্দরী । রাজপুত্রের মুখ আর ইশারায় দেখা গেল বহুবার জটিল প্রেম করার পুর্বলক্ষণ, বলার অযোগ্য এমনকি অসহিষ্ণু আনন্দ ! রাজপুত্র আর ডাকিনী সম্ভবত অন্তরজগতের ক্ষমতার দ্বারা পরস্পরকে হত্যা করল । কেমন করেই বা তারা পরস্পরকে এইভাবে মরতে সাহায্য করলো? লোকে যেমন বলে থাকে, ওরা মারা গেছে।
তবু রাজপুত্র নিজের প্রাসাদে বুড়ো হয়ে মারা গেল । রাজপুত্রই আসলে ডাকিনী ছিল । ডাকিনী ছিল রাজপুত্র ।
সূক্ষ্ম সঙ্গীত আমাদের চাহিদার তুলনায় কম ।
প্যারেড
ইল্যুমিনেশান ৪
ভাঁড়গুলো বেশ পালোয়ান । অনেকে তোমার শব্দগুলোকে শোষণ করেছে । প্রয়োজনহীন, তোমার বিবেক সম্পর্কে ওদের বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতা নিয়ে খেলা করার কোনো তাড়াহুড়ো নেই ।
কতো পাকতাড়ুয়া ওরা ! গ্রীষ্মরাতের মতন চোখদুটো হতবুদ্ধিময়, লাল আর কালো, তিনরঙা, ইস্পাতে সোনালি নক্ষত্র দেগে দেয়া ; আকৃতি বিকলাঙ্গ, সীসায় ভারি, ফ্যাকাশে, আগুনলাগা ; খসখসে গলার তড়িংবিড়িং নাচিয়েরা ! ফিকে হয়ে যাওয়া কারুকাজের নিষ্ঠুর দম্ভচলন ! --কেউ কেউ কমবয়সী--চেরুবিনোকে ওরা কোন দৃষ্টিতে দ্যাখে ? -- বিপজ্জনক সঙ্গতি আর আতঙ্ক-জাগানো কন্ঠস্বরের মালিক ওরা । শহরের রাস্তায় ওদের পাঠিয়ে দেয়া হয় খদ্দের ধরার জন্যে, বিরক্তিকর অলঙ্কারে সাজিয়ে
ওহ পাগলামির ভেংচিকাটা নৃশংস পারিজাত ! তোমার ফকির আর নাটুকে ভাঁড়ামো থেকে দূরে।
বিনা প্রস্তুতিতে তৈরি দুঃস্বপ্নে পাওয়া পোশাক পরে ওরা ডাকাতদের উপদেবতাদের রোমান্টিক, বিয়োগান্তক, আধ্যাত্মিক ধর্মকাহিনির নাটক করে যে ঘটনাগুলো আদপে কখনও ঘটেনি । চীনা, হটেনটট, ভবঘুরে, মূর্খ, হায়েনা, রক্তখেকো দেবতা, পুরোনো পাগলামি, ভয়ংকর রাক্ষস, জনপ্রিয় গৃহস্হ প্রবণতাকে পাশবিক ভঙ্গী আর আদরের সঙ্গে মিশিয়ে ফ্যালে । ওরা নতুন স্বরলিপি আর মিষ্টি গানের জন্যে অপেক্ষা করছে । ওস্তাদ ভোজবাজিকর, ওরা জনগণকে আর জায়গাকে বদলে ফেলে চৌম্বক মঞ্চপদ্ধতি দেখায় । ফুলে-ওঠা চোখে, রক্ত গান গায়, হাড় পুরু হয়ে ওঠে, চোখের জল আর গালের রুজ গড়িয়ে পড়ে । ওদের গরাদ আর সন্ত্রাস মুহূর্তের জন্যে বা কয়েক মাস বজায় থাকে ।
এই বর্বর প্যারেডের চাবিকাঠি আছে শুধু আমার হেফাজতে ।
সেকেলে
ইল্যুমিনেশান ৫
গ্রিক অধিদেবতা প্যান-এর করুণাময় ছেলে ! ধনুকের মতন তোমার ভ্রুযুগল ফুলের তোড়ায় ঢাকা আর চোখ যেন বৈঁচিফল, মহার্ঘ শ্রবণসঙ্গীত, এগিয়ে চলো । মদের বাদামি তলানির রঙে রাঙানো ; তোমার গালগুলো ভেতরে ঢোকা । তোমার চোখ-দাঁত ফ্যাকাশে । তোমার বুক এক বাদ্যযন্ত্র, তোমার ফ্যাকাশে হাতে তারগুলো বেজে ওঠে । তোমার পেটের ভেতরে স্পন্দন হয় যেখানে একজোড়া যৌনতা ঘুমোয় । রাতের বেলা, হেঁটে যাও, উরুকে সামান্য তুলে, তারপর অন্য উরু আর ওই বাঁ পা ।
শোভাময় হয়ে ওঠা
ইল্যুমিনেশান ৬
তুষারপাতের উল্টোদিকে, এক ঢ্যাঙা সৌন্দর্যের প্রতিমা । এই আদর-পাওয়া দেহকে মৃত্যুর বাঁশি আর ঘিরেফেলা মৃদু সঙ্গীত ফাঁপিয়ে তোলে, এমনভাবে ফুলে ওঠে আর কাঁপে যেন ভুত : অসাধারণ মাংস থেকে রক্তবর্ণ আর কালো ঘা ফেটে বেরোয় । জীবনের জন্য যুৎসই রঙগুলো গভীর হয়ে ওঠে, নাচতে থাকে আর গড়ে উঠতে-থাকা এই দৃষ্টিপ্রতিভা থেকে নিজেদের আলাদা করে ফ্যালে । কাঁপুনি তোলে আর আর্তনাদ করে যন্ত্রণায় আর এদের মদমত্ত সুগন্ধের প্রভাব ভরে দেয় সেই জাগতিক আর ভাসন্ত সঙ্গীতকে যা জগতসংসার, অনেক পেছনে, আমাদের সৌন্দর্যমাতার দিকে ছুঁড়ে মারে -- সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, দুই পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ায় । ওহ, আমাদের হাড়ে পরানো হয়েছে এক নতুন প্রণয়োদ্দীপক দেহ ! ওহ, ফ্যাকাশে মুখশ্রী ; ঘোড়ার চুলে-সাজানো ঢাল, কেলাসিত বাহু ! গাছের জঙ্গল আর ওজনহীন বাতাসের ভেতর দিয়ে আমাকে কামান দাগতে হবে !
জীবনসমূহ
ইল্যুমিনেশান ৭
১
ওহ পবিত্রভূমির বিশাল অ্যাভেনিউগুলো, মন্দিরের চূড়াগুলো ! সেই ব্রাহ্মণের কী হলো যিনি আমাকে প্রবাদগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন ? আমি সেই বুড়িকে এখনও দেখতে পাই, একই সময়ে আর জায়গায় ! নদীদের রূপালি সময় আর আলোকমালা আমার এখনও মনে আছে, কাঁধের ওপরে আমার সঙ্গীর হাত, পরস্পরের আদর মনে আছে যখন আমরা দুজনে মশলার গন্ধেভরা মাঠে দাঁড়িয়েছিলুম । -- আমার চিন্তাকে ঘিরে একদল রক্তবর্ণ পায়রা বকবকম করে । -- এখানে নির্বাসিত, প্রতিটি সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট নাটক অভিনয় করার জায়গা আমার ছিল । আমি তোমাকে দেখাতে পারতুম অজানা ঐশ্বর্য । তুমি যে ধনসম্পদ খুঁজে পেয়েছিলে তার ইতিহাসকে আমি চিহ্ণিত করেছি । এবার দেখব কী ঘটতে যাচ্ছে ! বিশৃঙ্খলার মতনই আমার প্রজ্ঞাকে অবজ্ঞা করা হয় । কীই বা আমার শূন্যতা, তোমার জন্যে অপেক্ষমান নিশ্চলতার তুলনায় ?
২
আমার পূর্বজদের তুলনায় আমি একজন গুণসম্পন্ন আবিষ্কারক ; এমনকি, সঙ্গীতবিশারদ, যে প্রেমের সূত্রের মতন কিছু খুঁজে পেয়েছে । বর্তমানে, মনোরম আকাশের তলায় বিটকেল এক দেশের ভদ্রমানুষ, নিজের ভিখারিসূলভ শৈশবের স্মৃতির মাধ্যমে আমি বিচলিত হবার প্রয়াস করি, আমার শিক্ষানবীশি আর কাঠের জুতো পায়ে এখানে আসা, আমার তর্কপ্রিয়তা, আমার পাঁচ কি ছয়বারের বৈধব্য, আর আমার কয়েকবারের মহামাতলামি, যখন আমার বিচক্ষণ মগজ আমার বেরাদরদের হট্টগোলে অংশ নিতে বাধা দিয়েছিল । যেহেতু এই সন্দেহপ্রবণতা আর প্রয়োগ করা যাবে না, আর এমনিতেও আমি তরতাজা উদ্বেগে সমর্পিত -- আমি আশা করছি যে অত্যন্ত বিদ্বিষ্ট উন্মাদ হয়ে উঠবো ।
৩
বারো বছর বয়সে আমি যে চিলেকোঠায় বন্দী ছিলুম, আমি জগতসংসারের বিষয়ে জানতুম, আমি মানুষের হাস্যকর অবস্হা বর্ণনা করেছিলুম । মাটির তলাকার মদের ভাঁড়ারে আমি ইতিহাস শিখলুম । উত্তরের শহরের কোনো এক রাতের ভোজনোৎসবে আমি পূর্বসূরী মহান তৈলচিত্রকরদের নারীদের অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা পেয়েছিলুম । প্যারিসের এক প্রাচীন গলিতে, আমাকে ধ্রুপদী বিজ্ঞান শেখানো হয়েছিল । প্রাচ্যদেশ দিয়ে ঘেরা এক চমৎকার জায়গায় আমি সম্পূর্ণ করেছিলুম আমার প্রচুর কাজ আর কাটিয়েছিলুম আমার সুবিখ্যাত অবসরযাপনের দিনগুলো । নিজের রক্তকে করে তুলেছিলুম চঞ্চল । আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে । সেই বিষয়ে আর ভাববারও দরকার নেই । আমি সত্যিই কবর অতিক্রম করে এসেছি, এবং কর্তব্য-বিষয়ে স্বাধীন ।
প্রস্হান
ইল্যুমিনেশান ৮
যথেষ্ট দেখা হলো । সমগ্র আকাশের তলায় দৃষ্টিপ্রতিভার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ।
অনেক পাওয়া হলো । শহরগুলোর আওয়াজ, সন্ধ্যাবেলা, এবং আলোয়, আর তা সদাসর্বদা।
অনেক জানা হলো । জীবনের নির্ণয়গুলো । --হে দৃষ্টিপ্রতিভার ধ্বনিসমূচ্চয় !
নতুন অনুরাগ এবং ধ্বনি লক্ষ্য করে সেইদিকে প্রস্হান !
রাজকীয়
ইল্যুমিনেশান ৯
সুন্দর একটি দিনে, সুশীল মানুষদের মাঝে, চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন একজন মহিমান্বিত পুরুষ ও নারী : ‘বন্ধুগণ, আমি চাই ও রানি হোক !’ ‘আমি রানি হতে চাই !’ মহিলা হাসলেন আর কাঁপতে লাগলেন । পুরুষটি বন্ধুদের জানালেন রহস্যোদ্ঘাটনের কথা, কষ্টের জীবনের কথা । দুজনে পরস্পরের দেহে হেলান দিয়ে মূর্চ্ছা গেলেন ।
সত্যিই, তারা সারা সকাল রাজা হয়ে কাটালো, বাড়িগুলোয় ঝোলানো হলো গাঢ় লাল ফেস্টুন, আর সারা দুপুরও, তারা হেঁটে চলল পামগাছের বাগানের দিকে ।
যুক্তিযুক্ততার অভিমুখে
ইল্যুমিনেশান ১০
ড্রামের ওপরে তোমার একটা আঙুলের টোকায় সব আওয়াজ হারিয়ে যায় আর নতুন করে গড়ে তোলে ঐকতান ।
তোমার একটা পদক্ষেপ উদ্দীপ্ত করে নতুন মানুষদের আর তাদের সামনে দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তোমার মুখ অন্য দিকে তাকায় : নতুন প্রেম ! তোমার মুখ নিজের জায়গায় ফেরে -- নতুন প্রেম!
‘আমাদের অদৃষ্ট পালটে দাও, মহামারী শেষ করো’, মহাসময়ের তালে তাল মিলিয়ে এই শিশুরা তোমাকে গেয়ে শোনায় । ‘যেখানেই হোক না কেন, আমাদের বৈভব এবং ইচ্ছা লালিত হোক’, ওরা দয়াভিক্ষা করে ।
চিরকালীন থেকে তোমার আগমন, তুমি সব জায়গার জন্য প্রস্হান করবে ।
মদোন্মত্ত সকাল
ইল্যুমিনেশান ১১
হে আমার শুভ ! হে আমার সুন্দরী ! আমি ভয়ে পশ্চাৎপদ হই না এমন বর্বর তূর্যনিনাদ !
সন্মোহিত আরাম ! প্রথম বারের খাতিরে, সুন্দর দেহ আর অজানা কাজের জন্য হুররে !
আরম্ভ হয়েছিল বাচ্চাদের হাসিতে, শেষও হবে সেইভাবে । এই বিষ আমাদের শিরায় তখনও বইবে যখন তূর্যনিনাদ ফিরে আসবে, আমাদের আরেকবার পুরোনো বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেয়া হবে । ওহ, আমরা এখন অমন দৈহিক শাস্তির উপযুক্ত, আমাদের দেহ আর আত্মাকে দেয়া মানবোত্তর প্রতিশ্রুতিকে সঠিক বুঝে উঠতে হবে : এই প্রতিশ্রুতি, এই পাগলামি ! সৌষ্ঠব, বিজ্ঞান, সন্ত্রাস ! ওরা অঙ্গীকার করেছে যে শুভ এবং অশুভর বৃক্ষকে অন্ধকারে পুঁতে ফেলা হবে, স্বৈরতান্ত্রিক সদগুণগুলোকে নির্বাসন দেয়া হবে, যাতে এখানে আমরা বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে আসতে পারি । এটা আরম্ভ হয়েছিল বিশেষ বিরক্তি নিয়ে এবং ফুরিয়েও গেলো -- আমরা এই শাশ্বতকে তক্ষুনি দখল করতে পারিনি বলে -- তা সুগন্ধের দাঙ্গায় শেষ হয় ।
শিশুদের হাসি, কেনা-গোলামদের বিচক্ষণতা, অক্ষতযোনি মেয়েদের আত্মসংযম, এখানকার মুখগুলো আর জিনিসপত্রের আতঙ্ক, সতর্কতার স্মৃতির দরুন তুমি পবিত্র । এটা আরম্ভ হয়েছিল
মূর্খতার সঙ্গে, এবার দ্যাখো, শেষ হচ্ছে আগুন আর বরফের দেবদূতদের দ্বারা । ক্ষণকালের মদ্যপ পবিত্র সতর্কতা ! যদি তুমি কেবল মুখোশের জন্য আমাদের বরাদ্দ করে থাকো । সাধনপ্রণালী, আমরা তোমাকে সমর্থন করছি ! আমরা ভুলিনি কালকে তুমি আমাদের প্রতিটি শতককে মহিমান্বিত করেছিলে । বিষে আমাদের বিশ্বাস আছে । আমরা জানি কেমন করে প্রত্যেক দিন আমাদের সমগ্র জীবন দিয়ে দিতে হবে ।
এই কালখণ্ড হলো গুপ্তঘাতকদের ।
প্রবাদসমূহ
ইল্যুমিনেশান ১২
আমাদের চারটে অবাক চোখের জন্যে এই জগতসংসারকে যখন ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে একটিমাত্র অন্ধকার জঙ্গলে -- দুটি অনুগত বাচ্চার জন্য একটি সমুদ্রতীরে -- আমাদের সুস্পষ্ট সমবেদনার জন্য সঙ্গীতের ঘরে -- আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো ।
এখানে তলায় কেবল একজনমাত্র বুড়ো লোক থাকুন, শান্ত আর সুন্দর, ‘অচেনা বিলাসে’ পরিবেষ্টিত -- আমি তোমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসবো ।
আমাকে তোমার স্মৃতিগুলো বাস্তবে পরিণত করতে দাও -- আমাকে যুবতী হতে দাও, যে তোমার গলা টিপে ধরবে -- আমি তোমার দম বন্ধ করে দেবো ।
✯
যখন আমরা যথেষ্ট বলশালী -- কে-ই বা পশ্চাদপসরণ করবে ? যথেষ্ট মৌজমস্তিতে থাকলে -- কে-ই বা ইয়ার্কি করতে ছাড়ে না ? যখন আমরা সবচেয়ে বেশি অসূয়াপূর্ণ -- ওরা আমাদের কি-ই বা বানাতে পারে ? নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে তোলো, নাচো, হাসো । -- আমি কখনও ভালোবাসাকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবো না ।
✯
ভিখারিনী মেয়েটা, দানবী খুকি, আমার কমরেড ! তুমি এই হতভাগিনী নারীদের কতোটা মনোযোগ দাও, এই প্যাঁচপয়্জার, আর আমার সমস্যা । তোমার অসম্ভব কন্ঠস্বর দিয়ে নিজেকে আমাদের সঙ্গে বেঁধে ফ্যালো, সেই কন্ঠস্বরখানা ! এই জঘন্য বিষাদের একমাত্র আশা ।
✯
জুলাই মাসের মেঘাচ্ছন্ন ভোর । বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ছাইয়ের স্বাদ -- বনানীর ঘামের গন্ধ ঝরে পড়ছে উনানের কোনে -- ভিজে ফুলগুচ্ছ -- তৃণাঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ -- খেতের খালগুলো থেকে কুয়াশা -- তাহলে কেন খেলনাপাতি আর ধুপকাঠি নয় ?
✯
আমি এক ঘণ্টাঘর থেকে আরেক ঘণ্টাঘর পর্যন্ত দড়ি টাঙিয়েছি ; জানালা থেকে জানালা পর্যন্ত ফুলের মালা ; নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র পর্যন্ত সোনার শেকল ; আর আমি নাচছি ।
✯
ওপরের ঝিল থেকে অবিরাম বাষ্প ওঠে । সফেদ সূর্যের বিপরীতে কোন জাদুনারীরা জেগে উঠবেন? কোন বেগুনি পাতার পর্ণরাজি ঝরে পড়বে ?
✯
জনগণের টাকা যখন ঢেলে দেয়া হচ্ছে ভাইবেরাদরদের ভোজনোৎসবে, মেঘের ভেতরে বাজতে থাকে গোলাপরঙা আগুন ।
✯
চিনা কালির আকর্ষণ সুগন্ধকে গভীর করে তোলে, আমার নিশিপালনে ক্রমান্বয়ে ঝরে পড়ে কালোরঙের পাউডার । -- আমি গ্যাসের আগুন কম করে দিই, বিছানায় নিজেকে ছুঁড়ে ফেলি, আর ছায়াগুলোর দিকে ফিরে, দেখতে পাই তোমাদের, আমার কন্যারা, আমার রানিরা !
শ্রমিকেরা
ইল্যুমিনেশান ১৩
ওহ ফেবরুয়ারি মাসের সেই উষ্ণ সকাল ! আমাদের বিদকুটে অন্নবস্ত্রহীন স্মৃতি, আমাদের যৌবনের দারিদ্রদশা থেকে অসময়ের দখিনা বাতাস এসে জাগিয়ে তুললো ।
বাদামি আর শাদা চাককাটা সুতির স্কার্ট পরেছিল হেনরিয়েকা, গত শতকের ফ্যাশান, সন্দেহ নেই ; ফিতে বাঁধা শিরাবরণ, রেশমের স্কার্ফ । শোকসন্তাপের চেয়েও তা দুঃখজনক । আমরা শহরতলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম । আবহাওয়া ছিল মেঘলা, আর ওই দখিনা বাতাস চঞ্চল করে তুলছিল বিধ্বস্ত বাগান আর শুকনো তৃণভূমি থেকে উড়ে আসা দুর্গন্ধকে ।
এটা আমাকে যতোটা বিরক্ত করেছে ততোটা আমার স্ত্রীকে করতো না । ওপরের দিকের রাস্তায় গতমাসের বানভাসি তৈরি করে গেছে জলের চাদর, ও আমাকে দেখালো তাতে কয়েকটা ছোট্ট মাছ ।
শহরটা, কারখানাগুলোর আওয়াজ আর ধোঁয়াসুদ্ধ, রাস্তা ধরে আমাদের পিছু নিয়েছিল । ওহ, অন্য জগতসংসার, আকাশ আর ছায়ায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত বসতি ! দখিনা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল দুর্দশাময় শৈশবের ঘটনাগুলো, আমার গ্রীষ্মের বিষাদ, ভাগ্য আমার থেকে সদাসর্বদা যে ভয়ংকর বিপুল শক্তিমত্তা ও জ্ঞান দূরে সরিয়ে রেখেছে । না ! আমরা এই কৃপণ দেশে গ্রীষ্ম কাটাবো না যেখানে আমরা বাগদত্ত অনাথ ছাড়া আর কিছুই হতে পারবো না। আমি এই শক্ত হাত দিয়ে প্রিয় দৃশ্যগুলোকে টেনে নিয়ে যেতে দেবো না ।
সেতুগুলো
ইল্যুমিনেশান ১৪
স্ফটিকের ধূসর আকাশ । সাঁকোগুলোর অদ্ভুত নকশা, কখনও সোজা, কখনও বেঁকা, আবার কোনোটা কোনাকুনি বেঁকে গিয়ে আগেরটার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আর এই নকশাগুলো খালের আলোজ্বলা বাঁকগুলোয় আবার তেমন করেই পুনরাবৃত্তি করেছে, কিন্তু এতো দীর্ঘ আর হালকা যে নদীর তীর, গুম্বজের গুরুভারে, ডুবে গিয়ে ছোটো হয়ে আসে । এই সাঁকোগুলোর কয়েকটা এখনও চাদরে ঢাকা । অন্যগুলোয় রয়েছে মাস্তুল, সঙ্কেত, অপলকা নিচু পাঁচিল । পাতলা তারে মোড়া, আর মিলিয়ে গেছে ; তীর থেকে দড়িদড়া উঠে আসে । তুমি একটা লাল কোট দেখে চিনতে পারো, হয়তো অন্যান্য কোটও এবং সঙ্গীতযন্ত্র । এই জনপ্রিয় রেশগুলো কি, বিখ্যাত কনসার্টের টুকরো, জনগণের জাতীয়-সঙ্গীতের অবশিষ্টাংশ ? জলের রঙ ধূসর এবং নীল, সমুদ্রের বাহুর মতন চওড়া ।
একটা শাদা রশ্মি, অনেক ওপরে থেকে এসে, হাসির নাটককে লোপাট করে দ্যায় ।
শহর
ইল্যুমিনেশান ১৫
এক মহানগর যাকে এই জন্যে আধুনিক মনে করা হয় যে বাড়িগুলোর বাইরের দিক সাজানোয় আর নগরের পরিকল্পনায় প্রয়োগ করার জন্য পরিচিত উপলব্ধিগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ; তারই আমি এক ক্ষণজীবী আর তেমন বিচ্ছিন্ন নাগরিক নই । এখানে তুমি কুসংস্কারের একটিও স্মৃতিস্তম্ভের হদিশ পাবে না । সংক্ষেপে, নৈতিকতা আর ভাষাকে সরলতম প্রকাশে নামিয়ে আনা হয়েছে ! লক্ষাধিক এই লোকজন যারা পরস্পরকে জানার প্রয়োজন অনুভব করে না, নিজেদের শিক্ষাদীক্ষা, কর্মকাণ্ড, বার্ধক্যে এতো মিল যে তাদের আয়ু মহাদেশের গোলমেলে সংখ্যাতত্ব যা বলেছে তার চেয়েও বেশ কম । তাই, আমার জানালা দিয়ে, দেখতে পাই নতুন প্রেতরা শাশ্বত ঘন ধোঁয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে --- আমাদের বনানীঘেরা ছায়া, আমাদের গ্রীষ্মের রাত ! -- প্রতিহিংসর নতুন গ্রিক দেবতারা, আমার কুটিরের সামনে, যা আমার স্বদেশ, আমার সমগ্র হৃদয়, কেননা এখানে সবকিছুরই পরস্পরের সঙ্গে মিল আছে -- ক্রন্দনহীন মৃত্যু, আমাদের সক্রিয় কন্যা আর চাকরানি, রাস্তার কাদায় বেপরোয়া ভালোবাসা আর ফালতু অপরাধ ফুঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ।
গাড়ির চাকার দাগ
ইল্যুমিনেশান ১৬
ডানদিকে বাগানের এই কোনে গ্রীষ্মের ভোর পাতাদের আর কুয়াশাকে এবং শব্দগুলোর ঘুম ভাঙায়, আর বাঁদিকের ঢালে স্যাঁতসেতে রাস্তায় বেগুনি ছায়ায় অগুন্তি দ্রুতগামী চাকার দাগ ধরে রাখে । ঐন্দ্রজালিক মিছিল । ওয়াগন, সত্যিই, ঝকমকে কাঠের তৈরি জানোয়ার তাতে, খুঁটি আর রঙবেরঙ চাঁদোয়া, কুড়িটা চিত্রবিচিত্র সার্কাস ঘোড়ার পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল, আর পুরুষেরা আর বাচ্চারা তাদের অদ্ভুত জানোয়ারের পিঠে -- কুড়িটা গাড়ি, ঢেউখেলানো, ঢাকাখোলা আর ফুলে সাজানো প্রাচীন ঘোড়ারগাড়ির মতন কিংবা যেমন পরীর গল্পে থাকে, শহরতলির যাত্রাভিনয় দেখতে যাবার পোশাক-পরা বাচ্চায় ঠাশা : -- এমনকি কফিনও, তাদের রাতের আচ্ছাদনের তলায়, জাঁকালো আবলুস পালকে, নীল-কালো মাদিঘোড়ার দৌড়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো ।
নগরেরা
ইল্যুমিনেশান ১৭
শহরসমূহই বটে ! এই সেই লোকগুলো যাদের জন্যে স্বপ্নেদেখা উত্তর-আমেরিকার আলেঘানি পাহাড় এবং লেবানন মঞ্চায়িত হয়েছিল ! স্ফটিক আর কাঠের তৈরি রাখাল-কুটির যা অদৃশ্য রেললাইন আর কপিকলে চলে । গ্রিক সূর্যদেবের মূর্তি দিয়ে ঘেরা মরা আগ্নেয়গিরির হাঁমুখ, আর তামার তৈরি পামগাছেরা আগুনশিখায় সুরেলা ধ্বনি তুলছে । রাখাল কুটিরের পেছনে খালের ধারে ভালোবাসার পানোৎসব প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল । গিরিসঙ্কটের ভেতরে শিকারের রুনুঝুনু বাজে । দৈত্যবৎ গায়কদের সমাবেশ ঘটে মধ্যযুগের ফরাসি রাজার সোনালি ঝিলমিলে পোশাকের মতন শীর্ষদেশের আলোয় ।
ঘুর্নিজলের ভেতরে পাটাতনের ওপরে, রাজা শার্লামেইনের বীরপুরুষেরা তাদের শৌর্যের ভেরীধ্বনি করে । অতলর ওপরের সাঁকোগুলোয়, আর সরাইখানার ছাদে, আকাশের তাপ মাস্তুলগুলোকে পতাকা দিয়ে ঢেকে ফ্যালে । দেবতাপ্রতিম ভঙ্গুর মূর্তিগুলো চারণভূমি দখল করে ফ্যালে যেখানে দেবদূততুল্য নারীসিংহীরা হিমানী-সম্প্রপাতে প্রবেশ করে । সর্বোচ্চ চূড়াগুলোর সারির ওপরদিকে, রয়েছে ভিনাসের শাশ্বত জন্মের ঝড়ঝাপটায় আক্রান্ত এক সমুদ্র, অরফিউসের ক্ষণস্হায়ী সঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ আর দামি মুক্তো এবং শঙ্খধ্বনিতে মথিত -- সেই সমুদ্র জাগতিক বজ্রবিদ্যুৎকে অনেক সময়ে অন্ধকার করে তোলে । ঢালু জায়গায়, ফুলের ফসল, আমাদের তরোয়াল আর পেয়ালার মতন, নিচের দিকে । পিঙ্গলরঙা মোটা কাপড়ে স্বপ্নদায়িনী পরীরানিদের মিছিল । তাদের পা ঝর্ণায় আর বনগোলাপের ঝাড়ে, ওইখানে উঁচুতে মৃগয়ার অধিষ্ঠাত্রীদেবীর দুধ খাচ্ছে এক হরিণ । শহরতলির মাতালনারীরা ফোঁপাচ্ছে, আর চাঁদ জ্বলে যাচ্ছে আর শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া করছে । ভিনাস সন্ন্যাসী আর স্যাকরাদের সঙ্গে প্রবেশ করছে গুহার মধ্যে । সারিসারি ঘণ্টাঘর গেয়ে উঠছে জনগণের অভিপ্রায় । হাড়ের তৈরি দুর্গ থেকে ভেসে আসছে অজানা সঙ্গীত । যাবতীয় কিংবদন্তির প্রকাশ ঘটছে আর শহরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে হরিণের দল । থেমে গেছে ঝড়ের পুণ্যালোক । রাতের পানোৎসবে অবিরাম নাচছে বর্বরেরা । এবং, একবার, আমি বাগদাদের রাস্তার গোলমালে নেমে পড়লুম, যেখানে ভিড়ের লোকেরা তরতাজা শ্রমের আনন্দ-গান গাইবার জন্য জড়ো হয়েছিল, নিস্তেজ হাওয়ায়, পাহাড়ের বিখ্যাত মায়াপুরুষদের এড়াবার জন্যে বিনা ক্ষমতায় পাক খাচ্ছিল । আমার তন্দ্রাভাব আর যৎসামান্য হেলডোল যে এলাকা থেকে আসে তা ফিরে পেতে কোন ধরণের অস্ত্র, কোন ধরণের মনোরম সময় প্রয়োজন ?
ভবঘুরের দল
ইল্যুমিনেশান ১৮
সমব্যথী ভাই ! ওর কাছে আমার কোনও নৃশংস নিশিপালন আছে ! ‘আমি এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টাকে দখল করে নিতে বিফল হয়েছিলুম । আমি ওর অকর্মণ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলুম । যদি আমাদের নির্বাসনে যেতে হয়, কেনা-গোলমী করতে হয়, তা হবে আমার দোষ।’ অদ্ভুত দুর্ভাগ্য আর বোকামির জন্য ও আমার প্রশংসা করেছিল, আর তার সঙ্গে জুড়েছিল অশান্তিকর কারণ ।
এই শয়তান পণ্ডিতকে আমি বিদ্রুপ করে উত্তর দিয়েছি, আর জানালার কাছে গিয়ে তা শেষ করেছি । বিরল সঙ্গীতরেখার চালচলনের অপর পারের চারণভূমিতে আমি ভবিষ্যতের রাতের বিলাসের মায়াপুরুষ গড়েছি ।
এই অস্পষ্ট স্বাস্হবিধিসন্মত চিত্তবিক্ষেপের পর, আমি খড়ের মাদুরের ওপরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তুম । এবং, বলতে গেলে প্রতি রাতে, যেই আমি ঘুমিয়ে পড়তুম, বেচারা ভাইটি উঠে পড়তো, মুখে দুর্গন্ধ, চোখে দেখতে পাচ্ছে না -- যেমন ও নিজের সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতো -- আর নিজের নির্বোধ কান্নার স্বপ্নে বিভোর আমাকে ঘরের ভেতরে টানাটানি করতো !
বাস্তবিক, সত্যি বলতে কি, আমি ওকে ওর সূর্যসন্তানের প্রাগৈতিহাসিক স্হতিতে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছিলুম -- আর আমরা ঘুরে বেড়ালুম, গুহার মদে ভরণপোষণ করে, আর পথের বিসকিট খেয়ে, আমি পরিসর আর ফরমুলা খুঁজে পাবার জন্যে অধৈর্য ।
নগরসকল
ইল্যুমিনেশান ১৯
আধুনিক বর্বরতার অপরিমিত ধারণাকে ছাপিয়ে যায় সরকারি নগরায়ন । পরিবর্তনাতীত ধূসর আকাশ যে অনুজ্বল আলো ছড়াচ্ছে তা বর্ণনা করা অসম্ভব ; স্হাপত্যের রাজসিক রোশনাই, আর মাটিতে অনন্তকালীন তুষার । ধ্রুপদী স্হাপত্যের বিস্ময়কর কাজগুলোকে, একান্ত আতঙ্কজনক রুচিতে, ওরা আবার গড়েছে । হ্যাম্পটক কোর্টের চেয়ে কুড়িগুণ বড়ো মিউজিয়ামে তৈলচিত্রের প্রদর্শনী দেখি । মন্ত্রালয়ের সিঁড়িগুলোর নকশা তৈরি করেছিল নরওয়ের এক নেবুচাদনেজ্জার ; যে অধস্তন অধিকারীদের দেখেছিলুম তারা, যেমন হয় আরকি, ব্রাহ্মণদের থেকেও গর্বিত, আর বিশাল মূর্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং এলাকার তত্ববধায়কদের দেখে আমি ভয়ে কেঁপে উঠছিলুম । চৌরাস্তার বাড়িগুলোর ঘেঁষাঘেঁষি, তাদের ছাদ, আর পাঁচিলঘেরা বারান্দা, তাদের ঘণ্টাঘরগুলো থেকে কোনঠাশা করে দিয়েছে । বিস্ময়কর শিল্পচর্চায় পার্কগুলোয় উপস্হাপন করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক প্রকৃতি । ভালো জায়গাগুলোয় রয়েছে অনির্বচনীয় চৌহদ্দি : সমুদ্রের শাখা, নৌকাবর্জিত, তার নীল রঙের ঘষাকাচকে ছড়িয়ে দেয় মোমের তৈরি বিশাল গাছে গুরুভার জাহাজঘাটার মাঝবরাবর । একটা ছোটো সাঁকো চলে গেছে সন্ত চ্যাপেলের গোলাকার গম্বুজের ঠিক নিচের সিংদরোজা পর্যন্ত । গম্বুজটা পনেরোহাজার ফিটের ইস্পাতের কলাকৃতি দিয়ে গড়া ।
তামার তৈরি সাঁকো, মাচান, সিঁড়ি যা আচ্ছাদিত বাজারকে পাক খেয়ে উঠেছে, কয়েকটা দৃষ্টিভঙ্গীতে, আমি ভাবলুম হয়তো শহরের ব্যাপ্তি বিচার করে দেখব ! তা ছিল মস্তোবড়ো ব্যাপার যার সম্পর্কে নির্ণয় নিতে পারলুম না : নগরদুর্গের ওপরদিকে আর নিচে যে এলাকাগুলো রয়েছে তাদের স্তর কেমনতর ? আমাদের দিনকালে পর্যটকদের পক্ষে দেখে বেড়ানোটা অসম্ভব । ব্যবসার চৌহদ্দি, সেকেলে গ্যালারিসহ, একই রকমের শৈলীর সার্কাস । কোনও দোকান চোখে পড়ছে না, কিন্তু পথের তুষারে মাড়িয়ে যাবার দাগ ; কয়েকজন নবাব, লণ্ডনের রবিবারের সকালে হাঁটার লোকেদের মতন বিরল, হীরের তৈরি ঘোড়ারগাড়ির দিকে এগোয়। কয়েকটা লাল মখমলের পালঙ্ক : মরুদেশের পানীয় বিতরন করা হচ্ছে, যার দাম আটশো থেকে আটহাজার টাকার মধ্যে পড়ে। সার্কাসের ভেতরে নাট্যালয় খোঁজার ধারণা সম্পর্কে আমি নিজেকে বললুম যে দোকানগুলোতে নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিষণ্ণ নাটক অভিনীত হয় । আমার মনে হয় পুলিশও আছে ; কিন্তু আইনগুলো নিশ্চয়ই এমন অদ্ভুত যে অ্যাডভেঞ্চার করার ভাবনা আমায় এড়িয়ে যায়।
শহরতলিগুলো, পারিসের যেকোনো সুন্দর রাস্তার মতন পরিচ্ছন্ন, সূর্যের আলোর সাদৃশ্যের আনুকূল্য পায় ; গণতান্ত্রিক উপাদানের সংখ্যা কয়েক হাজার আত্মা হবে । এখানেও, ঘোড়াগুলো সার বেঁধে নেই ; শহরতলিগুলো বিটকেলভাবে গাঁয়ের দিকে গিয়ে হারিয়ে যায়, যাকে বলে ‘প্রশাসনিক এলাকা’, যা ছড়িয়ে পড়েছে শেষহীন পশ্চিমদিকের জঙ্গল আর পাদপবাগান পর্যন্ত, যেখানে বর্বর কুলীনরা যে আলো নিজেরা তৈরি করেছে, সেখানে সংবাদ শিকার করতে বেরোয়।
নিশিপালন
ইল্যুমিনেশান ২০
১
এই হলো আলোয় আস্হা, বিছানার ওপরে কিংবা মাঠে, জ্বরে নয়, অবসন্নতাতেও নয়।
ইনি বন্ধু প্রদীপ্ত নন দুর্বলও নন । তিনিই বন্ধু ।
ইনি ভালোবাসবার ; যন্ত্রণা দেয়া হয়নি, এবং যন্ত্রণাদায়ক নন ।
চাওয়া হয়নি বাতাস এবং জগতসংসারকে । জীবন ।
--এটা কী, তাহলে ?
--আর শীতল হয়ে যায় স্বপ্ন ।
২
মাঝখানের স্তম্ভে আলো ফিরে আসে । ঘরের দুই প্রান্তসীমা থেকে, একরকম মঞ্চই বলা যায়, মিলবিশিষ্ট দ্রোহীদের সাক্ষাৎ ঘটে । পাহারাদারের মুখোমুখি দেয়ালে কার্নিসের মতন কোনাকুনি জায়গায় মনস্তত্বের পারম্পর্য, আবহাওয়ার চাদর এবং ভূতাত্বিক ঢেউ -- গভীরভাবে অনুভুত গাঢ় এবং দ্রুত দলাদলি, যেখানে সব ধরনের প্রাণী তাদের যাবতীয় দর্শনানুপাত নিয়ে রয়েছে।
৩
নিশিপালনের লন্ঠন এবং চাদর, ঢেউয়ের শব্দ তোলে, রাতের বেলায়, জাহাজের কাঠামোর পাশে, হালকে ঘিরে ।
সমুদ্রের নিশিপালন যেন খেটে-খাওয়া অ্যামেলির স্তনযুগল ।
কারুকার্য-শোভিত পর্দাগুলো, কিছুটা ওপরদিকে তোলা, পান্নারঙা লেসের ঝালর, যাকে লক্ষ্য করে নিশিপালনের পায়রারা উড়ে যায় ।
কালো উনানের সামনের পাথর, সমুদ্রতীরের প্রকৃত সূর্য : আহ, ইন্দ্রজালের ঝর্ণা ; ভোরের একমাত্র দৃশ্য, ঠিক এখনই !
অতীন্দ্রিয়
ইল্যুমিনেশান ২১
তীরের ঢালুতে দেবদূতেরা তাদের পশমের পোশাকে ইস্পাত আর পান্নার চারণভূমিতে পাক খায়।
পাহাড়ের গোলাকার মাথার ওপরে লাফাতে থাকে আগুনশিখার মাঠ । বাঁদিকে খেতের আলগুলোকে পদদলিত করেছে পাক থেকে বেরিয়ে প্রতিটি হত্যা, প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি বিপর্যয়ের ধ্বনি। প্রান্তরেখার ওপারে ডানদিকে আরোহণরেখা, প্রগতির দিকে ।
এবং, যখন শীর্ষের কার্নিস দিয়ে গড়ে উঠছে ছবির মোচড় আর লাফিয়ে ওঠা মানবসমুদ্র আর রাত্রির শঙ্খধ্বনি ।
নক্ষত্র এবং আকাশের ফুলেল মিষ্টতা আর বাদবাকিরা নেমে আসে বাঁধের উল্টোদিকে, যেন চুবড়ির ভেতরে -- আমাদের মুখোমুখি, এবং গড়ে তোলে অতল মঞ্জরী এবং নিচের নীল ।
ঊষা
ইল্যুমিনেশান ২২
আমি গ্রীষ্মের ভোরকে গ্রহণ করে নিলুম ।
প্রাসাদগুলোর সামনে এখনও কোনোকিছুর নড়চড় নেই । জল মারা গিয়েছিল । বনানিঘেরা পথকে ভিড়ের ছায়া এখনও ছেড়ে যায়নি । আমি হাঁটছিলুম, তপ্ত শ্বাস নিচ্চিলুম, আর দামি পাথরগুলো ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলো, আর ডানাগুলো শব্দ না করে উড়লো ।
প্রথম অভিযানে, শীতল ফিকে আলোয় আগে থেকেই আলোকিত রাস্তায়, একটা ফুল আমাকে তার নাম জানালো ।
দেবদারু গাছে ঘেরা ফর্সা আলুলায়িত ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসলুম : চাঁদির শীর্ষভূমির ওপরকার ঈশ্বরীকে চিনতে পারলুম ।
তারপর একের পর এক অবগুন্ঠন সরালুম । গলির ভেতরে ঢুকে, হাত নাড়ালুম । সমতলভূমিতে গিয়ে আমি মেয়েটিকে মোরগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করলুম । শহরে ঢুকে, মেয়েটি ঘণ্টাঘর আর গম্বুজের মাঝে পালিয়ে গেল, এবং, ভিখারির মতন শ্বেতপাথরের জেটি পেরিয়ে, আমি ওকে ধাওয়া করলুম ।
রাস্তার ওপর দিকে, জলপাই বনের কাছে, ওর অবগুন্ঠনসুদ্ধ ঘিরে ফেললুম মেয়েটিকে, আর অনুভব করলুম ওর বিশাল শরীর বেশ ছোটো । জঙ্গলের পাদদেশে পড়ে গেল ভোর আর বালকটি ।
ঘুম ভাঙতে, দুপুর ।
ফুলগুলো
ইল্যুমিনেশান ২৩
সোনার ছাদ থেকে -- রেশমের সুতো, ধূসর পাতলা কাপড়, সবুজ মখমল এবং স্ফটিকের চাকার মাঝে যা রোদ্দুরে ব্রোঞ্জের মতন কালো হয়ে যায় -- আমি লক্ষ্য করি চাঁদির সুতোর কারুকাজ-করা জাজিমের ওপরে ফেলেরাখা শেয়ালকাঁটা, চোখ এবং চুল ।
হলুদ সোনার টাকায় মণিরত্নের গুঁড়ো, পান্নার গম্বুজকে ধরে রেখেছে মেহগানি থাম, গোলাপজলকে ঘিরে সাদা সাটিনের টুকরো আর চুনীর মিহিন জল ছেটানো হয়েছে ।
বড়ো নীল চোখ আর তুষার-আঙ্গিকের কোনো দেবতার মতন, শ্বেতপাথরের ছাদে সমুদ্র ও আকাশ ডেকে আনছে কচি ও তরতাজা গোলাপগুচ্ছ ।
পার্থিব রাত্রি
ইল্যুমিনেশান ২৪
দেয়ালের প্রহসনমূলক ফাটল খুলে ফেলছে এক দমকা ঝড় -- ভাঙাচোরা ছাদগুলোর কড়িবরগাকে ঢেকে ফেলছে -- এলোমেলো করে দিচ্চে বাঁধের পাঁচিল -- অন্ধকার করে ফেলছে জানালাগুলো ।
দ্রাক্ষালতার থেকে দূরত্বে, সিংহমুখ নর্দমার ওপরে আমার পা রেখে --- আমি এই জুড়িগাড়িতে চাপলুম যার সময় সুস্পষ্টভাবে উত্তল কাচে লেখা, বাইরে বেরিয়ে আসা প্যানেল, আর ঢেউখেলানো বসার জায়গা । আমার তন্দ্রার শবযান, আলাদা করে দ্যায়, আমার বোকামির মেষপালকের কুঁড়েঘর, বাতিল রাজপথের মাটিতে আমার শকট বাঁক নেয় : এবং ঝাঁকুনির দরুণ ডানদিকের জানালায় ফিকে চাঁদনি আকারগুলো, গাছের পাতা, স্তন পাক খেতে থাকে।
--একটা সবুজ আর একটা নীল, বেশ গভীর, দৃশ্যটাকে আক্রমণ করে । জোড়াতালি দেয়া নুড়িপথের ফলে ঘোড়ার বর্ম খুলে যায় ।
-- এখানে কেউ ঝড়ের জন্যে সিটি বাজায়, সোডোমের লোকজন আর জেরুজালেমের লোকজন, বন্য পশু এবং সৈন্যবাহিনী ।
( -- ঘোড়ারগাড়ির চালক এবং স্বপ্নের প্রাণীরা কি আবার নিয়ে যাবে শ্বাসরুদ্ধকর ঝোপঝাড়ে, রেশমি বসন্তঋতুর চোখে আমাকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে । )
--এবং আমাদের, চাবুক মেরে, লেহ্য জল আর ছড়িয়ে পড়া খরায়, কুকুরদের চিৎকারে গড়াগড়ির জন্যে পাঠানো হবে…
--বাঁধের পাঁচিলগুলো এক নিঃশ্বাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ।
সামুদ্রিক
ইল্যুমিনেশান ২৫
তামা ও চাঁদির রথ --
চাঁদি ও ইস্পাতের জাহাজমুখ--
সমুদ্রের ফেনায় লাঙল চালানো---
কাঁটাগাছের খুঁটি ওপড়ানো ।
উষর প্রান্তরের বিস্তার,
আর জোয়ার-ভাটায় আঁকা রেখা,
পূর্বদিকে ঘুরতে-ঘুরতে বয়ে চলে যায়,
জঙ্গলের থামগুলোর দিকে,
জেটির খুঁটিগুলোর দিকে,
যার লোহার বাতাগুলো আলোর ঘুর্ণিঝড়ে চূর্ণ ।
শীতকালের ভোজনোৎসব
ইল্যুমিনেশান ২৬
নাটুকে-মজার বস্তির পেছনদিকে আওয়াজের প্রপাত । গোলোকধাঁধার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা অ্যাভেনিউ আর বাগানে, চক্রাকার বাজি অনেকক্ষণ জ্বলে -- সূর্যোদয়ের সবুজ আর লাল । চুল-সাম্রাজ্যের বিনুনিতে হোরেসের কবিতার উপদেবীর দল -- গোলগাল সাইবেরিয় মহিলা, ফরাসি চিত্রকরের আঁকা ছবির মতন চিনা মেয়েরা ।
মানসিক যন্ত্রণা
ইল্যুমিনেশান ২৭
এরকম কি হতে পারে যে মেয়েটি আমাকে ক্ষমা পাইয়ে দেবে শাশ্বতভাবে বিধ্বস্ত উচ্চাকাঙ্খা থেকে-- বহুকালের দারিদ্র্যকে মেরামত করে আরামদায়ক সমাপ্তি ঘটাবে -- আমাদের মারাত্মক আলস্যের লজ্জায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে সাফল্যের দিন ?
( ও পামগাছ ! হীরক ! ভালোবাসা ! প্রাণশক্তি ! -- প্রতিটি আনন্দ ও গরিমার চেয়ে উচ্চতর !-- সবরকমের, সব জায়গায় -- রাক্ষস, দেবতা -- এখানে বসবাসের যৌবন ! )
ঐন্দ্রজালিক বিজ্ঞান এবং সামাজিক ভাতৃত্বের আন্দোলনকে কি আদি স্বাধীনতার প্রগতিশীল পুনর্বাসন হিসাবে যত্নে পালন করা হবে ?...
কিন্তু এই রক্তচোষা মেয়ে যে আমাদের শায়েস্তা করে সে হুকুম দেয় যে আমরা যেন ওর দেয়া খুদকুঁড়োয় নিজেদের মজায় রাখি, নয়তো আরও মজা চালিয়ে যাও ।
ক্লান্ত বাতাস এবং সমুদ্রের মাঝ দিয়ে জখমের গমন ; যন্ত্রণায়, খুনি জল এবং বাতাসের নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে ; হাসিমুখ অত্যাচারের মাঝ দিয়ে, তাদের কোলাহলপূর্ণ স্তব্ধতার দিকে ।
মেট্রপলিটান
ইল্যুমিনেশান ২৮
নীলাভ খাঁড়ি থেকে ওসিয়ানের সমুদ্র পর্যন্ত, গোলাপি ও কমলারঙের বালুকাবেলায়, মদের রঙের আকাশ যাকে ধুয়ে দিয়েছে, স্ফটিকের বীথি ওপরে উঠে গিয়ে আড়াআড়ি ভাগ করে ফেলেছে, যা তখনই দখল করে নিয়েছে গরিব কমবয়সী পরিবারেরা যারা ফলবিক্রেতাদের দোকানে কেনাকাটা করে । বৈভব নেই । -- এই নগর !
আলকাতরার মরুভূমি থেকে, সরাসরি উড়াল দিয়ে কুয়াশার আতঙ্কজনক পরতগুলোর তলায় যে আকাশ বাঁক নেয়, পিছিয়ে যায়, নেমে যায়, তাকে গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া যা শোকার্ত সমুদ্র বিলিয়েছে, হেলমেট পরে পালিয়েছে, চাকা, জাহাজ, ঘোড়ার লেজের তলায় বাঁধা চামড়া -- সেই সংগ্রাম !
মাথা তোলো : ওই ধনুকাকৃতি কাঠের সাঁকো ; সামারিয়ার শেষ সব্জি-উঠোন, শীতল রাতের দ্বারা কাঁপানো লন্ঠনের আলোয় উজ্বল মুখোশ ; আওয়াজ-তোলা পোশাকে বোকা জলপরী, নদীর তলদেশে ; মটরখেতে জ্বলজ্বলে করোটি -- এবং অন্যান্য অলীক ছায়ামূর্তির প্রবাহ -- গ্রামগুলো। রাস্তার দুই কিনারে রেইলিঙ আর দেয়াল, ঝোপঝাড়ের প্রসারণ থামাতে পারেনি, আর নৃশংস ফুলের দল যাকে তুমি বলবে আত্মা আর সহোদরা । একঘেয়েমি জাগানো নাটক-- রাইননদীর অতিঅভিজাতদের পরীদের গল্পের সম্পত্তি, জাপানি, প্যারাগুয়ের গুয়ারানি, ওরা প্রাচীনকালের সঙ্গীত বুঝতে পারার জন্যে এখনও যোগ্য -- সরাইখানা আছে যা আর সবসময় খোলা থাকে না-- আছে রাজকুমারীরা, আর যদি তুমি বেশি অভিভূত না হয়ে থাকো, নক্ষত্রদের অধ্যয়ন করো-- আকাশ ।
সকালে যখন, যুবতীটির সঙ্গে, তুমি তুষারের ফুলকির মাঝে লুটোলুটি খেয়েছিলে. সবুজ ঠোঁট, বরফ, কালো পতাকা আর নীলাভ আলোর রশ্মি, আর মেরু-সূর্যের বেগুনিরঙা সুগন্ধ -- তা তোমার জীবনীশক্তি ।
অমার্জিতের দল
ইল্যুমিনেশান ২৯
ঋতুদের আর দিনগুলোর অনেক পরে, লোকজন আর দেশগুলো, রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই । )
বীরত্বের পুরোনো তূর্যনিনাদ কাটিয়ে ওঠার পর -- আমাদের হৃদয়ে আর মাথায় আক্রমণ অব্যহত রেখেছে -- প্রাচীন গুপ্তঘাতকদের থেকে বেশ দূরে ।
--ওহ ! রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই । )
ভাবাবেশসমূহ !
তুষারের ঝাপটায় ঝরছে আলোকচ্ছটা -- ভাবাবেশসমূহ ! -- জাগতিক হৃদয় থেকে ছোঁড়া হীরকের হাওয়ায় বৃষ্টিতে আগুন, আমাদের পোড়াবার জন্যে । -- হে জগতসংসার !--
( পুরোনো আশ্রয় এবং পুরোনো আগুনশিখা থেকে, যা তুমি শুনতে পাও আর অনুভব করো, )
আলোকচ্ছটা এবং সামুদ্রিক ফেনা । সঙ্গীত, খাঁড়ির মন্থন আর নক্ষত্রে জমাটবাঁধা ঝুলন্ত তুষার।
হে ভাবাবেশ, হে জগতসংসার, হে সঙ্গীত ! এবং এখানে, আকৃতি, ঘাম, চুল এবং দুই চোখ, ভেসে যায় । এবং শ্বেত অশ্রুজল, ফুটন্ত -- হে ভাবাবেশসমূহ ! -- এবং নারীকন্ঠস্বর পৌঁছে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির তলদেশে এবং সুমেরুর গুহাগুলোয় ।
পতাকা...
অভিক্ষিপ্ত সৈকতাংশ
ইল্যুমিনেশান ৩০
আমাদের গ্রামের বাড়ি আর তার বাগানের উল্টোদিকে সোনালি সকাল আর শিহরিত সন্ধ্যা খুঁজে পেল আমাদের দুই মাস্তুলঅলা পোত, সমুদ্র থেকে কিছুটা দূরে, তৈরি করে ফেলেছে শৈলান্তরীপ যা এপিরাসদেশ কিংবা গ্রিসের পেলোপনিজ, জাপানের প্রধান দ্বীপ, কিংবা আরবের মতন ছড়ানো!
ফিরে-আসা তত্বে আলোকিত মন্দিরগুলো ; উপকূলের আধুনিক প্রতিরক্ষার অমেয় দৃশ্য ; উষ্ণমণ্ডলের ফুলদল আর গ্রিকদের আসবদেবতার নকশাকাটা বালিয়াড়ি ; কার্থেজের বড়ো খাল আর নোংরা ভেনিসের বাঁধ ; এটনা আগ্নেয়গিরির হালকা উদ্গীরণ, ফুলের আর গ্লেসিয়ারের জলের তৈরি তুষার-ফাটল ; জার্মান পপলার গাছে ঘেরা ধোপারঘাট ; জাপানি গাছের ঝাঁকড়া মাথায় ছাওয়া ঢালের ওপরে বর্ণনাতীত বাগান ; এবং স্কারবরো ও ব্রুকলিনের ‘রাজকীয়’ এবং ‘অভিজাতদের’ প্রাসাদের সামনেদিক ; আর তাদের দুই পাশে রেললাইন , খোঁড়াজমি, হোটেলের চড়াই, ইতালি, আমেরিকা, এশিয়ার সবচেয়ে মনোরম সবচেয়ে বিশাল নির্মাণ, বর্তমানে দামি আলোকমালায় ঝিলমিলে, পানীয় এবং মৃদুমন্দ বাতাস, ভ্রমণকারী ও সম্ভ্রান্তদের দ্বারা প্রভাবান্বিত-- যারা দিনের আলোয়, অনুমতি দ্যায়, সাগরতীরের দ্রুতলয়ী নাচিয়েদের -- এমনকি শিল্পের মঙ্গলময় অলঙ্কারের সঙ্গীতকে, যাতে প্রাসাদের সৈকতাংশের সামনেদিককে অবিশ্বাস্যভাবে সাজিয়ে তোলা যায় ।
দৃশ্যাবলী
ইল্যুমিনেশান ৩১
প্রাচীন মিলনানন্তক নাটক তার সমন্বয়কে অনুধাবন করে, তার রাখালিয়া কাহিনিকে বিভাজন করে : তক্তায় গড়া প্রশস্ত পথ ।
পাথুরে জমির ওপরে একদিক থেকে আরেকদিক পর্যন্ত কাঠের দীর্ঘ বাঁধ, যেখানে অসভ্য ভিড় পাতাহীন গাছের তলায় চলাফেরা করে ।
কালো পাতলা কাপড়ে তৈরি দরদালানগুলোয়, লন্ঠন-হাতে আর ফেলে যাওয়া পথচারীদের অনুসরণ,
নাটুকে পাখি ঝাপট মেরে নেমে আসে রাজমিস্ত্রির তৈরি নৌকাসাঁকোয় যা দুলে ওঠে নামতে-থাকা দর্শকদের ভিড়ে ঢাকা দ্বীপপূঞ্জে ।
বাঁশি আর মদ্যপানে-ভরা গীতিকবিতামূলক দৃশ্য, ছাদের মাপের উঁচু ঢালের কোনাকুনি আধুনিক আড্ডার বৈঠকখানায় কিংবা প্রাচ্যদেশের প্রাচীন হলঘরে ।
ঝোপঝাড়ের ঝুঁটিতে ঘেরা অ্যামপিথিয়েটারের প্রান্তে ঐন্দ্রজালিক দৃশ্যাবলী কৌশল করে -- কিংবা সরে যায় এবং গ্রিসের বোয়েটিয়ানদের জন্যে সুর বাঁধে, দীর্ঘ গাছেদের সঞ্চরণশীল ছায়ায়, খেতের কিনারায় ।
শিলা-বিভাজনের কাছে মজার অপেরা আমাদের মঞ্চের ওপরে টুকরো হয়ে যায় যেখানে দশটা বিভাজক পরস্পরের সঙ্গে মেলে, যা গ্যালারি থেকে আলোর পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ।
ঐতিহাসিক সন্ধ্যা
ইল্যুমিনেশান ৩২
যে সন্ধ্যাই হোক, বলতে গেলে, আমাদের আর্থিক আতঙ্ক থেকে যে পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন, নিজেকে আবিষ্কার করেন, একজন গুরুর হাত চারণভূমির বীণাকে জাগিয়ে তোলে ; পুকুরের তলায় তাস খেলা হয়, আয়না, রানি আর অনুগতদের প্রিয় ; সেখানে রয়েছেন সন্তেরা, পালতোলা জাহাজ, ঐকতানের সূত্র, এবং সূর্যাস্তের কিংবদন্তিপ্রতীম সঙ্গীতময়তা ।
শিকারিদের আর দলবলকে দেখে ও ভয়ে কেঁপে ওঠে । নাটক ঝরে পড়ে তৃণাচ্ছাদিত ভূমির চাপড়ায় । এবং গরিব ও দুর্বলদের এই বোকামির স্তরে বড়োই অপর্যাপ্ত !
ওর কেনা-গোলাম চোখে, জার্মানি চাঁদের দিকে মিনার তুলে উঠে যায় ; তার্তারদের মরুভূমিতে আলো জ্বলে ওঠে ; দিব্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে প্রাচীন বিদ্রোহ প্ররোচিত হতে থাকে ; সিঁড়ি আর পাথরের তৈরি আরামকেদারায় একটি ছোট্ট জগতসংসার, ফ্যাকাশে আর সমতল, তৈরি করা হবে । তারপর পরিচিত সমুদ্র ও রাত্রির নৃত্যানুষ্ঠান ; সদগুণহীন রসায়ন, এবং অসম্ভব সঙ্গীত ।
সেই একই বুর্জোয়া ইন্দ্রজাল যেখানে আমাদের ছোটো নৌকা নামিয়ে দ্যায় ! সবচেয়ে সাধারণ ডাক্তারও মনে করে যে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে নিজেকে সমর্পণ করা আর সম্ভব নয়, এ হলো দৈহিক আত্মগ্লানির কুহেলিকা, যার নিরীক্ষণ ইতিমধ্যে এক দুর্দশা হয়ে উঠেছে ।
না ! বাষ্পঘরের মুহূর্ত, বাষ্পীভূত সমুদ্র, ভূগর্ভস্হ অগ্নিকাণ্ড, অনুবর্তী অগ্নিকাণ্ড, ঘুরে-বেড়ানো গ্রহ এবং তার ফলে উন্মূলন, বাইবেলে বর্ণিত যৎসামান্য ঈর্ষার নিশ্চয়তা এবং যে নিয়মশৃঙ্খলায় তা মৌলিক সাক্ষ্যপ্রদান করবে -- যাই হোক, তা কিংবদন্তির ব্যাপার নয় !
বিচলন
ইল্যুমিনেশান ৩৩
জাঙ্গালের কিনারায় কারুকার্যময় ফিতের অবস্হানভঙ্গিমা,
স্টিমারের পেছনদিকে খাঁড়ি,
ঢালের দ্রুতি,
স্রোতের বিস্তারিত দোল
অসাধারণ আলোর মাঝ দিয়ে আকর্ষণ করে ভ্রমণকারীদের
এবং রাসায়নিক পরিবর্তন
উপত্যকার জলে পরিবেষ্টিত
এবং ঝড় ।
এরা পৃথিবীকে জয় করেছে
অন্বেষণ করেছে তাদের ব্যক্তিগত রাসায়নিক ধনসম্পদ ;
তাদের ভ্রমণে সঙ্গ দ্যায় আমোদপ্রমোদ আর আরাম ;
তারা নিজেদের সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যায়
জাতিদের সম্পর্কে, শ্রেনির এবং প্রাণীদের, এই জাহাজে
বিশ্রাম করে এবং ঘুর্নি
পাললিক আলোয়,
অভীষ্টসন্ধানের ভয়ঙ্কর রাত্রিগুলোতে ।
কেননা জিনিসপত্র, রক্ত, ফুলদল, আগুন, রত্নাবলীর পারস্পরিক কথোপকথন থেকে,
ধাবমান জাহাজের বারান্দায় উদ্বিগ্ন বিচার-বিবেচনা,
--দেখতে পাওয়া যায়, জলের গতি দিয়ে চালিত পথের ওই দিকে খাতের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে
দানবরা, অফুরান আলোয় আলোকিত করছে -- তাদের অভিষ্টসন্ধান ;
নিজেদের সমন্বিত পরমানন্দের লক্ষ্যে,
এবং আবিষ্কারের বীরত্বে ।
বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার মধ্যে
কমবয়সী যুগল জাহাজের কোনায় একা,
--তা কি ক্ষমার যোগ্য আদিম লজ্জা ?-
আর গান গাইছে ও পাহারা দিচ্ছে ।
তলদেশ
ইল্যুমিনেশান ৩৪
আমার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে বাস্তব যেহেতু কন্টকময় --- তবু আমি নিজেকে আবিষ্কার করলুম, আমার প্রেয়সীর ডেরায়, তখন বেশ বড়ো এক নীল-ধূসর পাখি ছাদের আলসের দিকে উড়ে আসছিল কিংবা সন্ধ্যার ছায়ায় আমার ডানাকে অনুসরণ করছিল ।
বিছানার শিয়রের দিকের পায়ার কাছে, আমি তখন সামলাচ্ছিলুম, মেয়েটির আদরের মণিরত্ন এবং তার সেরা পার্থিব শিল্পকর্ম, বেগুনি মাড়ির এক বড়ো ভাল্লুক, লোমে দুঃখমাখানো, স্ফটিকের চোখ আর কনসোল-টেবিলের ওপরে রাখা চাঁদির বাসনপত্র
তারা সব পরিণত হলো ছায়ায় এবং অগ্নিগর্ভ অ্যাকোয়েরিয়ামে ।
সকাল বেলায় -- জুনমাসের মারমুখো ভোর -- দৌড়ে চলে গেলুম মাঠে, যেন গাধা, যতোক্ষণ না ইতালির শহরতলির স্যাবাইন তরুণীরা এসে আমার ঘাড়ের ওপর পড়ছেন, আমার অভিযোগগুলো নিয়ে হাঁক পাড়লুম আর তড়পালুম ।
এইচ
ইল্যুমিনেশান ৩৫
যাকিছু দানবিক তা মালিনীর বিদকুটে অঙ্গভঙ্গীর অবমাননা করে । মেয়েটির একাকীত্ব হলো যৌনতার যন্ত্র ; ওর অবসন্নতা, প্রণয়োদ্দীপক কর্মশক্তি । শৈশবের দ্বারা কড়া নজরে রাখা, মেয়েটি ছিল, বিভিন্ন কালখণ্ডে, জাতিগুলোর অত্যুৎসাহী সুস্বাস্হবাহিকা । ওর দুয়ার গরিবিয়ানার জন্য অবারিত । সেখানে, যারা বেঁচে আছে তাদের নশ্বরতা মেয়েটির কামোচ্ছ্বাসে ও ক্রিয়ায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে ।
--ওহ, রক্তে জবজবে মেঝেতে আনাড়ি প্রেমের ভয়ঙ্কর কাঁপুনি এবং স্বচ্ছ উদযানে খুঁজে পাবে মালিনীকে ।
প্রার্থনা
ইল্যুমিনেশান ৩৬
আমার সহোদরা ভোরিংঘেমের লুইজি ভানেনকে: -- উত্তর সমুদ্রের দিকে ফেরানো তার নীল খোঁপা। -- জাহাজডুবির কারণে ।
আমার সহোদরা লেওনি অবোয় দ্য’অ্যাশবিকে । ওটস দিয়ে তৈরি মদ ! -- গুঞ্জরিত, জঘন্য, গ্রীষ্মের ঘাস । -- মায়েদের এবং বাচ্চাদের অসুখের খাতিরে ।
লুলুকে -- রাক্ষসী -- যে ‘লেস অ্যামিস’ যুগের বাগ্মীতার প্রতি তার আকর্ষণ এখনও বজায় রেখেছে আর তার অসম্পূর্ণ শিক্ষার উদ্দেশে । পুরুষদের জন্য । --মাদাম অমুককে।
যে বয়ঃসন্ধি আমার ছিল তার উদ্দেশে । এই বুড়ো সন্তকে, সন্ন্যাস কিংবা ধর্মপ্রচার । গরিবের প্রতিভাকে । এবং উচ্চপদস্হ যাজকদের ।
প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসকে, ধর্মবিশ্বাসের স্মৃতিস্হানকে এবং সেই সমস্ত ঘটনা যার কাছে লোকে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তের আকাঙ্খা অনুযায়ী কিংবা আমাদের নিজস্ব সঙ্কটপূর্ণ পঙ্কিলতার উদ্দেশে ।
এই সন্ধ্যায়, সুমেরুর তুষারচূড়ার সিরসেটোকে, মাছের মতন মোটা, আর দশ মাসের লালচে আলোর মতন ঝলমলে -- ( মেয়েটির হৃদয় পীতাভ তৈলস্ফটিক এবং স্ফুলিঙ্গসম ) -- আমার একমাত্র প্রার্থনা রাতের এলাকার মতন নিঃশব্দ এবং এই মরুঅঞ্চলের বিশৃঙ্খল সন্ত্রাসের চেয়েও দুঃসাহসী ।
যে কোনো মূল্যে এবং প্রতিটি পোশাকে, এমনকি আধ্যাত্মিক যাত্রাতেও । কিন্তু তারপর আর নয়।
গণতন্ত্র
ইল্যুমিনেশান ৩৭
‘পতাকা এগোয় অপরিচ্ছন্ন ভূদৃশ্যের মাঝে, আর আমাদের দেশোয়ালি বুলি ড্রামের আওয়াজকে মৃদু করে দ্যায় । দেশের মধ্যাংশে আমরা সবচেয়ে নিন্দিত বেশ্যালয়কে লালন করবো । যুক্তিপূর্ণ বিদ্রোহগুলোকে নির্বিবাদে নিকেশ করবো ।
মশলাদার এবং মদে বেহুঁশ দেশগুলোর উদ্দেশে ! -- সবচেয়ে দানবিক শোষণ, শিল্পোৎপাদনকারী বা মিলিটারি সেবার উদ্দেশে । এখান থেকে বিদায়, জানা নেই কোথায় । স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আমরা গড়ে তুলব হিংস্র দর্শন : বিজ্ঞান সম্পর্কে অবিদিত, আমাদের আরামের জন্যে ছলনাময় : গলায় দড়ি দিক জগতসংসার । সেটাই আসল প্রগতি । ফরোয়ার্ড -- মার্চ !’
পরী
ইল্যুমিনেশান ৩৮
নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দে, হেলেনের জন্যে কুমারী ছায়ায় এবং অকম্পমান ঔজ্বল্যে সঞ্চারিত হচ্ছে প্রাণশক্তি । গ্রীষ্মের তাপ বোবা পাখিদের সোপর্দ করা হয়েছিল এবং অপরিহার্য আলস্য, একটা শোকাতুর দামের অতীত মৃত ভালোবাসা আর ডুবন্ত সুগন্ধের উপসাগরে এক বজরাকে উদ্দেশ্য করে।
কাঠুরিয়াদের স্ত্রীদের চলনছন্দের পর, ধ্বংস হওয়া জঙ্গলের নীচের জলস্রোতের কলধ্বনিতে, এবং প্রতিধ্বনিত উপত্যকায় গোরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজে, আর নিষ্পাদপ প্রান্তরের কান্নায়।
হেলেনের শৈশবের কারণে কেঁপে উঠতো ঝোপঝাড় আর ছায়ারা, গরিবের বুক, আর স্বর্গীয় কিংবদন্তি।
আর ওর চোখদুটি এবং নৃত্য, দামি রশ্মির চেয়েও উন্নত, শীতের প্রভাব, আর মুহূর্তটির একক দৃশ্যের আনন্দ ।
যুদ্ধ
ইল্যুমিনেশান ৩৯
বাল্যকালে, আমার দর্শনানুপাতকে পরিশুদ্ধ করে দিয়েছিল বিশেষ আকাশ : যাবতীয় চরিত্রেরা আমার অবয়বে ছায়া ফেলেছিল । প্রপঞ্চরা সরে যেতো । এখন, মুহূর্তদের শাশ্বত সংক্রমণ
এবং গণিতের অশেষ আমাকে এই জগতসংসারের মাঝ দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায় যেখানে আমি প্রতিটি নাগরিক সন্মানে আত্মসমর্পণ করি, অপরিচিত বাচ্চাদের দ্বারা এবং পরিব্যপ্ত অনুভূতির দ্বারা । আমি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখি, যা সঠিক তার কিংবা শক্তিমত্তার, অভাবিত যুক্তি ছাড়াই। গানের একটা কলির মতন এটা অত্যন্ত সরল ।
দৈত্য
ইল্যুমিনেশান ৪০
ও হলো অনুরাগ এবং বর্তমান কেননা ও ফেনায়িত জলরাশির এবং গ্রীষ্মের শব্দাবলীর সামনে বাড়িটা গড়ে তুলেছে, ও যে কিনা খাদ্য আর পানীয়কে বিশুদ্ধ করেছে, ও যে কিনা অপসৃয়মান জায়গাগুলোর আকর্ষণ এবং সাময়িক নিবৃত্তির অতিমানবিক আনন্দ। ও হলো ভবিষ্যতের অনুরাগ, যে ক্ষমতা ও ভালোবাসায় আমরা, ক্রোধ ও ক্লান্তিকে ধরে রাখি, দেখি আমাদের পাশ কাটিয়ে পতাকাগুলোর মহোল্লাসের ভেতর দিয়ে ঝোড়ো আকাশের পানে চলে যাচ্ছে।
ও হলো ভালোবাসা, নিখুঁত এবং পুনরাবিষ্কৃত পরিমাপ, দারুণ এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলে, এবং অসীম-অনন্ত : মারাত্মক ক্ষমতার প্রিয়তম যন্ত্র । আমাদের নিজেদের এবং ওর আত্মসমর্পণের ত্রাস সম্পর্কে আমরা জানি : হে আমাদের স্বাস্হ্যের আনন্দ, আমাদের মৌলিক মানসিক শক্তির প্রেরণা, ওর জন্যে স্বার্থপর অনুরাগ ও আবেগ, ও যে কিনা ওর অনন্তকালীন জীবনে আমাদের ভালোবাসে… । এবং আমরা ওকে ডাকি আর ও সঙ্গ দেয় আমাদের...। এবং যদি আদর ফুরিয়ে যায়, তা অনুরণিত হয়, ওর প্রতিজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হয় : ‘এই সমস্ত কুসংস্কার দূর হোক, এই পুরোনো দেহগুলো, এই বাড়িঘর এবং এই সমস্ত কালখণ্ড । আসলে এই নবযুগ অন্ধকার !’
ও যাবে না ; ও আবার কোনো স্বর্গ থেকে নেমে আসবে না, ও নারীর ক্রোধ ও পুরুষের হর্ষকে, এবং যাবতীয় পাপের মুক্তি খুঁজে পাবে না : কেননা তা ফুরিয়ে গেছে, ওর অস্তিত্ব আছে, আর ওকে লোকে ভালোবাসে ।
হে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস, ওর মস্তক, ওর ছুটে চলা : আঙ্গিক ও কর্মশীলতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির অসম্ভব দ্রুতি!
হে মননশক্তির এবং বিশ্বলোকের বিশালতার বহুপ্রসূতা !
ওর দেহ ! স্বপ্নে দেখা উত্তরণ, নব্য-সন্ত্রাসের মুখোমুখি চুরমার ঐশ্বরিক করুণা !
ওকে নাগাল পাওয়া, ওর নাগাল পাওয়া ! ও পাশ দিয়ে চলে গেলে পুরোনো হাঁটুগাড়া আর ব্যথা উধাও হয় ।
ওর আলো ! যাবতীয় নাকিসুর এবং অসহ্য কষ্ট গভীর সঙ্গীতে বিলুপ্ত হয় ।
ওর পদক্ষেপ ! প্রাচীন আক্রমণের তুলনায় প্রচরণশীলতা আরও অস্বাভাবিক ।
হে ও আর আমরা ! অন্যের পরিত্যক্ত সেবার চেয়ে গর্ববোধ বেশি দয়ালু ।
হে জগতসংসার ! এবং নতুন দুর্ভাগ্যের সুস্পষ্ট গান !
ও আমাদের সবাইকে জেনেছে এবং ভালোবেসেছে । আজকের এই শীতের রাতে হয়তো আমরা জানতে পারবো, অন্তরীপ থেকে অন্তরীপে, বিক্ষুব্ধ মেরু থেকে জমিদারের পল্লীভবন পর্যন্ত, ভিড় থেকে বালিয়াড়ি পর্যন্ত, চাউনি থেকে চাউনি পর্যন্ত, শক্তি ও অনুভব ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কেমন করে ওকে অভিবাদন জানানো হবে আর দেখা হবে, এবং আবার পাঠিয়ে দেয়া হবে ওর যাত্রায়, আর জোয়ারের তলায় ও তুষারের মরুভূমির ওপরে, ওর দৃষ্টিপ্রতিভাকে অনুসরণ করে, ওর নিঃশ্বাস, ওর দেহ, ওর আলো ।
যৌবন
ইল্যুমিনেশান ৪১
১
রবিবার
সমস্যা তো আছেই, আকাশ থেকে অবধারিত পতন আর স্মৃতির আগমন এবং একত্রিত ছন্দ বাসাকে দখল করে নেয়, মাথাকে আর জগতসংসারের মনকে ।
--বনানী আর খেত পেরিয়ে একটা ঘোড়া শহরতলির ঘাসে দৌড়োতে আরম্ভ করে, প্লেগের অঙ্গারে ঝাঁঝরা । কোনো নাটকে একজন দুস্হ মহিলা, জগতসংসারের কোথাও, পরিত্যক্ত হবার অসম্ভাব্যতায় দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে । বেপরোয়া লোকেরা ঝড়ের , মাতলামির আর আঘাতের জন্যে অপেক্ষা করে আছে । নদীর ধারে ছোট্ট বাচ্চারা অভিশাপের কন্ঠরোধ করে ।
এবার আমাদের সমীক্ষা আবার শুরু করা যাক যা জনগণের মাঝে জেগে-ওঠা ক্লান্তিকর কাজের দ্বারা জড়ো করা হয়েছে ।
২
সনেট
স্বাভাবিক গড়নের পুরুষ, বাগানে ঝুলন্ত ফলের মাংসে তৈরি নয়, ওহ শৈশবের দিনগুলো ! দেহ হলো হেলাফেলায় নষ্ট করার ধনসম্পদ ; ওহ, প্রেমে, মননের দোষ না শক্তি ? রাজপুত্র এবং শিল্পীতে পৃথিবীর ঢালু অংশ ছিল উর্বর, এবং বংশধররা ও জাতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অপরাধ ও শোকে : জগতসংসার, তোমার ভাগ্য ও তোমার বিপদ । কিন্তু এখন, সেই খাটুনির পুরস্কার, তুমি, তোমার হিসেবনিকেশ, তুমি, তোমার ধৈর্যহীনতা, তোমার নাচের ও কন্ঠস্বরের চেয়ে বেশি কিছু নয়, স্হিরীকৃত নয়, বলপ্রয়োগ করেও নয়, যদিও আবিষ্কার ও যুক্তির দ্বিগুণ সাফল্যের ফলাফলের দ্বারা, নিজেকে জাহির না করে এবং ভাতৃত্ববোধের মানবিকতায়, চিত্রহীন ভূমণ্ডলে -- শক্তিমত্তা ও অধিকার প্রতিফলিত করে সেই নৃত্য ও কন্ঠস্বরকে, যা কেবল এখনই প্রশংসিত...
৩
কুড়ি বছর
নির্দেশক কন্ঠস্বর নির্বাসিত...দৈহিক অকপটতা তিক্তভাবে বাসি...ধীর লয়ের সঙ্গীত । আহ, বয়ঃসন্ধির অশেষ অহংকার, সাগ্রহ আশাবাদ : সেই গ্রীষ্মে, কতো ফুলে ভরা ছিল জগতসংসার ! বাতাস ও আদল শুকিয়ে যাচ্ছে...নপুংসকতা ও অনুপস্হিতিকে প্রশান্ত করার জন্যে গির্জার ঐকতান গায়কমণ্ডলী । কাচের ঐকতানমণ্ডলী রাতের সুর...সত্যিই স্নায়ুরা সত্বর শিকারে বেরোবে।
৪
তুমি এখনও অ্যান্টনির প্রলোভনে আকর্ষিত । ছেঁটে-ফেলা উৎসাহের সঙ, তুচ্ছ গর্ববোধের আক্ষেপ, দুর্বল হয়ে চলেছো, এবং সন্ত্রস্ত । কিন্তু তুমি নিজেকে কাজে লাগাবে : তোমার উচ্চাসনের চারিধারে যাবতীয় ঐকতানময় ও স্হাপত্যের সম্ভাবনা ঘুরে বেড়াবে । অদেখা নিখুঁত প্রাণীরা তোমার নিরীক্ষায় আত্মসমর্পণ করবে । তোমার চারিপাশে জড়ো হবে প্রাচীন জনগণের স্বপ্নালু কৌতূহল এবং অলস বৈভব । তোমার স্মৃতি এবং তোমার ইন্দ্রিয়েরা তোমার সৃষ্টির আবেগের খোরাক হয়ে উঠবে । আর যদি জগতসংসারের কথা বলো, তুমি উঠে দাঁড়াবে, তাতে কীই বা হবে ? কিচ্ছু নয়, যতোই যাই হোক, বর্তমানে যা আঁচ করা যাচ্ছে ।
বিক্রয়
ইল্যুমিনেশান ৪২
বন্ধকী কারবারিরা যা বিক্রি করেনি তা বিক্রয়ের জন্যে, আভিজাত্য ও অপরাধ যে অভিজ্ঞতা আস্বাদন করেনি, যা প্রেমের কাছে এবং জনসাধারণের নারকীয় সততার কাছে অজানা; তাকে সমসময় ও বিজ্ঞানের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই :
কন্ঠস্বরগুলোর পুনর্গঠন হয়েছে ; তাবৎ ঐকতানীয় ও সুরসংযোজিত কর্মচাঞ্চল্য এবং তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ ; উপলক্ষ, একক, আমাদের ইন্দ্রিয়কে মুক্ত করার জন্য !
দামের চেয়ে বেশি দরে দেহ বিক্রির জন্যে, অপরিচিত জাতির, জগতের, যৌনতার, কিংবা অধঃপতনের জন্য !
প্রতি পদক্ষেপে ধনদৌলতের উৎসার ! হীরের অবাধ বিক্রি !
জনগণকে বিক্রির জন্য নৈরাজ্য ; রসপণ্ডিতদের জন্য অদম্য আনন্দ ; প্রেমিক-প্রেমিকার জন্যে, অনুগতদের জন্যে নৃশংস মৃত্যু !
বিক্রির জন্য রয়েছে বসত এবং স্হানান্তর, খেলধুলা, নিখুঁত পুলক ও আরাম, এবং শব্দাবলী, প্রণোদন ও যে ভবিষ্যৎ তারা গড়ে তুলবে !
বিক্রির জন্যে রয়েছে শোনা যায়নি এমন গণনা ও ঐকতান-ধাবনের প্রয়োগ
আকস্মিকতা আবিষ্কার করে অভাবিত স্হিতিকাল, তার তাৎক্ষণিক মালিকানাসহ।
অদৃশ্য সমারোহ, অননুভবনীয় পরমানন্দের প্রতি আরণ্যক ও অশেষ আবেগ, সঙ্গে তাদের প্রতিটি পঙ্কিলতার জন্যে এবং ভিড়ের ভয়াবহ চালচলনের জন্যে পাগলকরা গোপনীয়তা।
বিক্রির জন্য রয়েছে দেহ, কন্ঠস্বর, প্রচুর প্রশ্নাতীত ধনদৌলত, সবকিছুই যা কখনই বিক্রির জন্যে নয় । বিক্রেতারা এখনও পর্যন্ত তাদের মাল শেষ করতে পারেনি ! বহুদিন পর্যন্ত দোকানদাররা তাদের বেতন দাবি করতে পারবে না !
[ রচনাকাল ১৮৭৩ - ১৮৭৫ ]
[ অনুবাদ : ২০১৯ ]
Sunday, May 12, 2019
স্বর্গ ও নরকের বিবাহ : উইলিয়াম ব্লেক
প্রস্তাবনা
থমথমে হাওয়ায় গর্জন করে উঠলেন রিনট্রাহ আর ওড়ালেন নিজস্ব আগুনের ঝড় ;
অনন্তে চলছিল ক্ষুধার্ত মেঘমালার সদম্ভ বিচরণ ।
.
একদা দুর্বল এবং বিপদের গলিপথে
সৎ মানুষটি হেঁটে যাচ্ছেন
মৃত্যু উপত্যকার মাঝবরাবর ।
যেখানে কাঁটার জন্ম গোলাপ পোঁতা হয়,
আর উষর প্রান্তর জুড়ে
গান গায় মৌমাছিরা ।
.
তারপর বেছানো হল সেই বিপদের গলিপথ
এবং একটি নদী আর এক ঝর্ণা
প্রতিটি চূড়ায় আর সমাধিতে,
আর অমলিন দুধসাদা হাড়ে
লাল মাটির প্রলেপ দেয়া হয়েছে ।
.
যতোদিন না সহজ পথ ছেড়ে দিয়ে দুবৃত্ত
এগিয়ে যায় বিপদের গলিপথে, আর
উষর ভূখণ্ডে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ ।
.
এখন এই ছিঁচকে সাপ-শয়তান হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে
অনুগ্র অবমানিত অবস্হায়
আর অলৌকিক এলাকার সৎ মানুষটি ক্রোধে চিৎকার করে ওঠেন
যেখানে চরে বেড়াচ্ছে সিংহের দল সেখানে ।
.
থমথমে হাওয়া গর্জন করে উঠলেন রিনট্রাহ আর ওড়ালেন নিজস্ব আগুনের ঝড় ;
অনন্তে চলছিল ক্ষুধার্ত মেঘমালার সদম্ভ বিচরণ ।
.
নতুন স্বর্গের পত্তন হয়েছে, আর তাঁর আবির্ভাবের পর কেটে গেছে তেত্রিশটি বছর, শাশ্বত নরকের ঘটেছে পুনরভ্যূদয় । আর দেখুন ! সমাধির ওপর বসে আছেন দেবদূত সুইডেনবোর্গ ; তাঁর রচনাবলী হল ভাঁজ করে রাখা কাপড়-চোপড় । এখন চলছে শত্রুদের রাজত্ব, আর স্বর্গে ঘটেছে প্রথম মানুষের প্রত্যাবর্তন ।
.
বিরুদ্ধাচরণ যদি না হয় তাহলে এগোনো যায় না ! মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চাই আকর্ষণ ও বিকর্ষণ, যুক্তিতর্ক ও তেজ, প্রেম ও ঘৃণা ।
ধর্মে যাকে শুভ ও অশুভ বলা হয় তার উদ্ভব ওই পরস্পরবিরোধিতা থেকে ।
যে নিষ্ক্রিয়তা যুক্তিতর্কের আয়ত্তে তা-ই শুভ, তেজ থেকে যা স্ফূরিত হয় তা অশুভ ।
শুভ হল স্বর্গ । অশুভ হল নরক ।
পাপাত্মার কন্ঠস্বর
নিম্মলিখিত ভুলগুলোর উৎস হল তাবৎ ধর্মগ্রন্হ এবং পবিত্র নির্দেশিকা :
১. মানুষের রয়েছে দুটি সত্ত্বা, অর্থাৎ একটি দেহ, আর একটি আত্মা ।
২. দেহ থেকে যে তেজ নির্গত হয় তা-ই অশুভ, এবং যে যুক্তিতর্ককে বলা হয় শুভ তা আত্মা থেকে উদ্গত ।
৩. ঈশ্বর তাঁর পরাক্রমকে মেনে নেবার জন্য মানুষকে অনন্তকাল পর্যন্ত কষ্ট দেবেন ।
অথচ নিম্নলিখিত বৈপরীত্যগুলোই সত্য :
১. মানুষের দেহ আত্মা থেকে আলাদা নয়, কেননা যাকে দেহ বলা হয় তা পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা বোধগম্য আত্মার অংশ, এই কালবেলায় তা আত্মার প্রধান আগমপথ ।
২. তেজই জীবন এবং তা দেহ থেকে উদ্গত, আর যুক্তিতর্ক হল তেজের বাঁধন বা বাইরের খোলোশ ।
৩. তেজ হল অনন্তকালব্যাপী পরম আহ্লাদ ।
.
যারা আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণযোগ্য দুর্বলতার জন্য করে, এবং নিয়ন্ত্রণকারী, অর্থাৎ যুক্তিতর্ক, জবরদখল চালিয়ে অনিচ্ছুককে শাসন করে । আর নিয়ন্ত্রিত থাকার দরুণ তা হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়, তবুও তা কেবলমাত্র আসক্তির ছায়া ।
প্যারাডাইস লস্ট লেখা আছে সে কাহিনি, আর শাসক অর্থাৎ যুক্তিতর্ক, ওনাকে বলা হয় ত্রাণকর্তা ।
এবং সেই আদিতম দেবদূত, স্বর্গীয় কর্তার নির্দেশের যিনি ভোগদখলকারী, তাঁকে বলা হয় পাপাত্মা ওরফে শয়তান, আর তার সন্তানদের নাম পাপ ও মৃত্যু ।
কিন্তু বুক অব জব-এ মিলটনের ত্রাণকর্তার নাম শয়তান ।
সেহেতু দু’পক্ষই আশ্রয় নিয়েছে ইতিহাসে ।
যুক্তিতর্কে সত্যিই মনে হয়েছিল যে আসক্তিকে ঘরছাড়া করা হয়েছে, কিন্তু পাপাত্মার বক্তব্য হল যে ত্রাণকর্তার তো পতন ঘটেছিল, আর মহাশূন্য থেকে যে জিনিস তিনি চুরি করেছিলেন তা দিয়ে গড়ে তুললেন স্বর্গ ।
ধর্মশাস্ত্রে তা লেখা আছে, যেখানে উনি সান্ত্বনাদানকারীকে পাঠাবার জন্য ঈশ্বরের কাছে অনুনয় করছেন, কিংবা আসক্তিকে, যাতে যুক্তিতর্কের ভিতের ওপর ভাবনার প্রাসাদ গড়ে তোলা যায়, অগ্নিশিখার গর্ভে যাঁর নিবাস তিনি আর কেউ নন, কেবল ধর্মগ্রন্হের পরমেশ্বর । জেনে রাখুন যে যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুর পর তিনি পরমেশ্বর হয়েছিলেন । কিন্তু মিলটনে ঈশ্বরই নিয়তি, যিশু পঞ্চেন্দ্রিয়ের অনুপাত, এবং পবিত্র আত্মা হল মহাশূন্য ।
উল্লেখ্য : হাতে-পায়ে বেড়ি পরা অবস্হায় মিলটন দেবদূত ও ঈশ্বর বিষয়ে লিখেছিলেন, আর শৃঙ্খলমুক্ত অবস্হায় লিখেছিলেন নরক ও পাপাত্মাদের সম্পর্কে, কেননা তিনি ছিলেন সত্যকার কবি, এবং অজ্ঞাতসারে ছিলেন পাপাত্মার দলে ।
একটি স্মরণীয় কল্পনা
আমি যখন নরকের আগুনের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলুম, প্রতিভা উপভোগের আনন্দে বিভোর, দেবদূতের কাছে যা যন্ত্রণাদায়ক ও মস্তিষ্কবিকৃতির কারণ, আমি তাদের কিছু প্রবাদ সংগ্রহ করেছিলুম, এই ভেবে যে, একটি রাষ্ট্রের চরিত্র সেখানে ব্যবহৃত কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, ঠিক তেমনই বাড়িঘর আর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে বরং নরকের প্রবাদগুলো থেকে নারকীয় জ্ঞান অর্জন করা যায় ।
আমি যখন বাড়ি ফিরলুম, পঞ্চেন্দ্রিয়ের রসাতলে, যেখানে এই জগতে একটা চ্যাটালো গহ্বর রয়েছে, মেঘে ঢাকা বিশালাকার পাপাত্মাকে দেখতে পেলুম, পাষাণপিণ্ড ঘিরে পাক খেয়ে চলেছে । ক্ষয়িষ্ণু বাক্য দিয়ে নিচের বাক্যটা সে লিখেছিল, যা মানুষেরা নিজের বোধবুদ্ধি দিয়ে অনুভব করেছে, আর পৃথিবীতে তা তারা পাঠ করেছে :
আপনি জানেন প্রতিটি পাখি বাতাস কেটে এগোয়
তা এক পরমানন্দের জগত, তা কি আপনার পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে ঘেরা ?
নরকের প্রবাদসমূহ
সময়ের শিক্ষা হয় বীজে, শিক্ষা হয় ফসল তোলায়, শীতে আনন্দ ।
মৃতের হাড়ের ওপর চালাও তোমার ঠেলাগাড়ি, তোমার লাঙল ।
অমিতাচারে পথ জ্ঞানের রাজপ্রাসাদে যায় ।
বিচক্ষণতা হল অক্ষমতার প্রণয়িনী, এক ধনী কুৎসিত বুড়ি ।
যে নিজের আসক্তির নির্দেশে চলে না সে মড়কের জনক ।
দ্বিখণ্ডিত কীট লাঙলকে ক্ষমা করে ।
যে জল ভালোবাসে তাকে নদীতে চোবাও ।
যে গাছ জ্ঞানী দেখতে পান তা মূর্খ দেখতে পায় না ।
যার মুখশ্রীতে জ্যোতি নেই সে কখনও নক্ষত্র হবে না ।
সময়ের উৎপাদিকা-শক্তির সঙ্গে অনন্তকালের চিরপ্রণয় ।
ব্যস্ত মৌমাছির দুঃখের সময় নেই ।
ঘযী কেবল বোকামির সময় পরিমাপ করে ;
কিন্তু জ্ঞানীকে কোনও ঘড়ি ধরে মাপা যায় না ।
জাল কিংবা ফাঁদ ছাড়াই পাওয়া যায় সবরকম পুষ্টিকর খাবার ।
অভাবের বছরে বের করে আনো সংখ্যা, ওজন এবং মাপ ।
কেবল নিজের ডানায় ভাসলে কোনো পাখি বেশি উঁচুতে উড়তে পারে না ।
আঘাত নয় পপত্যাঘাত দেয় মৃতদেহ ।
শ্রেষ্ঠ কাজ হল নিজের কাছে অমন আরেকটি কাজ তুলে ধরা ।
মূর্খ যদি বারংবার বোকামি করে তাহলে সে জ্ঞানী হয়ে যাবে ।
বোকামি হল বজ্জাতির আবরণ ।
গর্বের আবরণ হল লজ্জা ।
আইনের পাথর দিয়ে কারাগার গড়ে ওঠে,
ধর্মের ইঁট দিয়ে নির্মিত হয় বেশ্যালয় ।
ময়ূরের গর্ব হল ঈশ্বরের গরিমা ।
ছাগলের ক্ষুন্নিবৃত্তি হল ঈশ্বরের উদারতা ।
সিংহের ক্রোধ হল ঈশ্বরের বিচক্ষণতা ।
নারীর নগ্নতা হল ঈশ্বরের কারুকাজ ।
অত্যধিক দুঃখ হাসে । অত্যধিক আনন্দ কাঁদে ।
সিংহের গর্জন, নেকড়ের আর্তনাদ, ঝোড়ো সমুদ্রের ক্ষোভ এবং খুংখার তরবারি হল
মহাকালের অংশ যা এমন পবিত্র যে মানুষ তা দেখতে পায় না ।
শেয়াল ফাঁদকে দোষ দেয়, নিজেকে নয় ।
আনন্দ প্রবেশ করে । দুঃখ বেরিয়ে আসে ।
পুরুষ পরে নিক সিংহের চামড়া, নারী পরুক মেষের পশম ।
পাখি একটি নীড়, মাকড়সা এক তন্তুজাল, মানুষ বন্ধুত্ব ।
স্বার্থপর হাসিমুখ মূর্খ এবং গোমড়ামুখ জেদিমূর্খ
দুজনকেই মনে করা উচিত জ্ঞানী, তারা উভয়েই হয়তো রাজদণ্ড ।
এখন যা প্রমাণিত হল তা একদা ছিল কল্পনা ।
ইঁদুর, ছুঁচো, শেয়াল খরগোশ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে শেকড়ে ।
সিংহ, বাঘ, ঘোড়া, হাতি নজর রাখে ফলাফলে ।
হ্রদ ধরে রাখে ; ঝর্ণা উপচিয়ে পড়ে ।
অপরিমেয়তাকে পূর্ণতা দিতে পারে একটিমাত্র চিন্তা ।
নিজের মনের কথা বলার জন্য সর্বদা তৈরি থাকুন,
তাহলে হীনচরিত্র মানুষেরা আপনাকে এড়িয়ে চলবে ।
যা-কিছু বিশ্বাসযোগ্য তা সত্যের রূপকল্প ।
কাকের কথা জানতে আগ্রহী হবার আগে ঈগলের সময় নষ্ট হয়নি কখনও ।
শেয়াল নিজেই নিজের ব্যবস্হা করে নেয়, কিন্তু সিংহের জন্য ব্যবস্হা করেন ঈশ্বর ।
চিন্তা করবেন সকালে ; কাজ করবেন দুপুরে ; খাবেন সন্ধ্যায় ; ঘুমোবেন রাতে ।
আপনার তাঁবেদারিতে যে ভুগছে, সে আপনাকে চেনে ।
লাঙল যেভাবে শব্দকে অনুসরণ করে, ঈশ্বর সেভাবে পুরস্কৃত করেন প্রার্থনাকে ।
আদেশের ঘোড়ার চেয়ে রোষের বাঘ আনেক জ্ঞানী ।
স্রোতহীন জলের কাছে বিষ আশা করবেন ।
যতক্ষণ না আপনি জানছেন যথেষ্টের বেশি কাকে বলে
ততক্ষণ আপনি জানতে পারবেন না যথেষ্ট কাকে বলে ।
মূর্খের ভর্ৎসনা শুনুন ! তা রাজার দেয়া উপাধি !
আগুনের চোখ, বাতাসের নাক, জলের হাঁ-মুখ, পৃথিবীর দাড়ির চুল ।
যে শৌর্যে দুর্বল সে চাতুর্যে দক্ষ ।
কী ভাবে বেড়ে উঠতে হবে তা আপেলগাছ বন্যগাছের কাছে জানতে চায় না,
ঘোড়ার কাছে সিংহ জানতে চায় না কী ভাবে শিকার করতে হবে ।
ধন্যবাদ দানকারী গ্রহীতা অনেক ফসল তোলে ।
অন্যেরা যদি বোকা না হয়, তাহলে আমাদের হতে হবে ।
মিষ্টি আনন্দের আত্মাকে কলুষিত করা যায় না ।
আপনি যখন ঈগলপাখিকে দ্যাখেন তখন প্রতিভার অংশবিশেষ দেখতে পান ;
মাথা একটু ওপর দিকে তুলুন ।
গুটিপোকা যেমন ডিম পাড়ার জন্য সবচেয়ে ভালো পাতাগুলো বাছে,
ঠিক তেমনই অনাবিল আনন্দে অভিশাপ দ্যায় পুরোহিত ।
একটা ছোট্ট ফুল ফোটাতে কয়েক যুগের শ্রম লাগে ।
বাঁধনকে নিন্দা করুন । আশীর্বাদ করুন চিত্তবিনোদনকে ।
পুরোনো মদ সবচেয়ে ভালো । সবচেয়ে ভালো নতুন জল ।
প্রার্থনাকারীরা হাল চষে না । ফসল তোলে না প্রশংসাকারী ।
আনন্দ হাসে না ! দুঃখ কাঁদে না !
মস্তক মহিমা, হৃদয় করুণা, লিঙ্গ সৌন্দর্য, হাত ও পা সমন্বয় ।
পাখির কাছে যেমন বাতাস কিংবা মাছের কাছে যেমন সমুদ্র,
তেমনই ঘৃণ্যের কাছে অবজ্ঞা ।
কাক চেয়েছে সবকিছু হোক কালো ; পেঁচা চেয়েছে সবকিছু হোক সাদা ।
সমৃদ্ধিই সৌন্দর্য ।
শেয়াল যদি সিংহকে উপদেশ দেয় বুঝতে হবে সে বেশ ঘোড়েল ।
সোজা পথের উপায় বাতলায় উৎকর্ষ, কিন্তু উৎকর্ষ-বঞ্চিত বেঁকা রাস্তাই প্রতিভার পথ ।
না-মেটা আকাঙ্খা লালন করার বদলে শিশুকে আঁতুড়ে মেরে ফ্যালো ।
যেখানে মানুষ নেই সেখানে প্রকৃতি উষর ।
সত্যকে বোধগম্য করার মতন,
আর তারপর অবিশ্বাসযোগ্য করার মতন করে বলা যায় না ।
যথেষ্ট । অথবা অনেক !
দেবতা আর প্রতিভার সাহায্যে প্রাচীন কবিরা সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে
সঞ্জীবিত করতে পারতেন, নাম ধরে ডাকতে পারতেন তাদের,
আর তাদের অলঙ্কৃত করতে পারতেন বনানী, নদী, পর্বতমালা,
হ্রদ, শহর, রাষ্ট্রের গুণাগুণ দিয়ে, আর এ-ছাড়া তাঁদের ব্যপ্ত ও
অনেকানেক সংবাদ সমস্তকিছুকে অনুভব করতে পারতো ।
আর বিশেষ করে প্রতিটি শহর ও দেশের প্রতিভাকে অধ্যয়ন করতেন তাঁরা,
মনের দেবতাকে উৎসর্গ করার জন্য ।
যতদিন না কোনো নিয়ম তৈরি হয়, যার সুযোগ অনেকে নিয়েছিল
আর বস্তুদের কাছ থেকে তাদের মনের দেবতাকে নিয়ে
দিতে চেয়েছে বিমূর্ত আদল কিংবা স্পষ্টীকরণের চেষ্টায়
কয়েদ করেছে স্হূলতাকে । তা থেকে আরম্ভ হল পুরোহিতপ্রথা :
কবিতার আঙ্গিক থেকে পূজার আঙ্গিক বাছাই ।
আর তারা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিল যে
এসমস্ত করা হচ্ছে দেবতাদের নির্দেশ অনুযায়ী ।
তাই মানুষ ভুলে গেল যে সকল দেবতার নিবাস হল মানুষের দেহ ।
একটি স্মরণীয় কল্পনা
ইসায়া এবং এজেকিয়েল পয়গম্বরদ্বয় আমার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলেন রাতে, আর আমি তাঁদের জিগ্যেস করলুম তাঁরা জোর গলায় কী করে বলছেন যে ঈশ্বর তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, আর তাঁরা কি তখন ভাবেননি যে লোকে তাঁদের ভুল বুঝবে, আর সেহেতু তাঁরা প্রতারণার কারণ হবেন ?
ইসায়া উত্তর দিলেন : আমি কোনো ঈশ্বরকে সুনির্দিষ্ট ইন্দ্রিবজাত উপলব্ধির মাধ্যমে দেখিনি, শুনিওনি, কিন্তু আমার চেতনা প্রতিটি জিনিসে আবিষ্কার করেছে অসীমকে ; আর তখন আমাকে যেমন রাজি করানো হয়েছিল, এবং আমি নিশ্চিত, খাঁটি ঘৃণামিশ্রিত কন্ঠস্বরই ঈশ্বরের কন্ঠস্বর, তাই আমি ফলাফলের কথা ভাবিনি, লিখে গেছি ।
তারপর আমি জানতে চাইলুম, “কোনো ব্যাপার সম্পর্কে যদি দৃঢ় বিস্বাস জন্মায় যে তা ‘বিশেষ ধরণের’, তাহলে কি তাকে সেই ‘বিশেষ ধরণের’ বলা যাবে ?”
তিনি উত্তর দিলেন, “তা বলা যায় বলেই বিশ্বাস করেন কবিরা, এবং কল্পনাশক্তির যুগে এই দৃঢ় বিশ্বাস পাহাড়কে পর্যন্ত সরিয়ে দিতে পেরেছে ; কিন্তু অনেকেই কোনোকিছু সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাসের যোগ্য নন ।”
তারপর এজেকিয়েল বললেন, “প্রাচ্যের দর্শন শিখিয়েছে মানুষের উপলব্ধির প্রথম নীতিটি । সৃষ্টির আদি সম্পর্কে কোনও কৌমরাষ্ট্র হয়তো বিশ্বাস করেছে একটি তত্ত্বে, আবার অন্যেরা আলাদা ত্ত্বে । আমরা ইজরায়েলে শিখিয়েছি যে প্রথম তত্ত্বটি হল কাব্যপ্রতিভা [এখন তোমরা যে-নাম দিয়েছ], আর বাদবাকি তা থেকে আহৃত, যার কারণ হল আমাদের হাতে অন্যান্য দেশের পুরোহিত এবং দার্শনিকদের নিগ্রহ, আর আমাদের ভবিষ্যবাণীর উৎস হল যে শেষাবধি সকল দেবতার আবির্ভাব আমাদেরটিতে প্রমানিত হয়েছে, এবং তাঁরা হলেন কাব্যপ্রতিভার উপনদী । আমাদের মহান কবিসম্রাট ডেভিড এই ব্যাপারটি ঐকান্তিক ভাবে চেয়েছিলেন, এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আবাহন করেছিলেন, বলেছিলেন যে এর সাহায্যে তিনি শত্রুদের বশীভূত করেন এবং রাজ্য শাসন করেন ; আর আমরা আমাদের ঈশ্বরকে এতো বেশি ভালোবেসেছি যে চারিপাশের কৌমরাষ্ট্রের দেববিগ্রহদের অবজ্ঞা করেছি, আর দাবি করেছি যে তারা দ্রোহী । এই ধরণের মতামতের দরুন মামুলি লোকেরা মনে করে যে সকল কৌমরাষ্ট্র বুঝি ইহুদিদের অধীন হয়ে যাবে ।”
“এই ব্যাপারটি,” বললেন উনি, “যাবতীয় দৃঢ় বিশ্বাসের মতন, আসবে আর যাবে, কেননা সমস্ত কৌমরাষ্ট্র ইহুদিদের রীতিনীতি মেনে চলে, এবং ইহুদি ঈশ্বরকে পুজো করে, এবং এর থেকে বেশি আর কীই বা আনুগত্য হতে পারে ?”
কিছুটা বিস্ময়ে আমি তা শুনলুম, এবং আমার নিজের প্রত্যয়কে কবুল করা দরকার । রাত্রিভোজের পর আমি ইসায়াকে বললুম, তাঁর হারানো রচনাবলী খুঁজে দিয়ে পৃথিবীকে অনুগ্রহ করুন ; তিনি বললেন, এর সমমূল্যের কিছুই হারায়নি । এজেকিয়েলও নিজের বিষয়ে সেকথা বললেন ।
আমি ইসায়াকে একথাও জিগ্যেস করলুম যে, কী কারণে তিনি তিন বছর তিনি খালি পায়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ালেন । তিনি উত্তর দিলেন, “ঠিক যে কারণে আমাদের প্রিয় বন্ধু ডায়োজেনেস করেছিল ।”
আমি তারপর এজেকিয়েলকে জিগ্যেস করলুম যে তিনি কেন গোবর খেয়েছিলেন, আর অতোকাল যাবত বাঁপাশ কিংবা ডানপাশ ফিরে শুলেন না কেন । তিনি উত্তর দিলেন, “সবাইকে অসীম উপলব্ধির স্তরে তুলে নিয়ে যাবার ইচ্ছায়। এই প্রক্রিয়াটি উত্তর আমেরিকার উপজাতিরা অভ্যাস করে, এবং সেই লোকটিকে সৎ বলে মনে করব যে নিজের বর্তমান আরাম ও বাসনা চরিতার্থ করার জন্য নিজের প্রতিভা ও বিবেককে জলাঞ্জলি দ্যায় ?”
যেমনটা আমি নরকে শুনেছিলুম, এই সনাতন ধারণাটি সত্য যে, ছয় হাজার বছরের শেষে আগুন পৃথিবীকে গিলে খেয়ে ফেলবে ।
কেননা দেবশিশুকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে নিজের জ্বলন্ত তলোয়ার নিয়ে জীবনবৃক্ষের তত্ত্বাবধান যেন সে করা ছেড়ে দ্যায়, এবং যদি তা করে তাহলে সমগ্র সৃষ্টিতে আগুন ধরে যাবে, আর তাকে মনে হবে অসীম ও পবিত্র, যদিও এখন তাকে মনে হচ্ছে সীমাবদ্ধ ও ভ্রষ্ট ।
যৌন আনন্দের উৎকর্ষের দ্বারা তা মিটে যাবে ।
কিন্তি সবচেয়ে আগে এই মতামত পরিত্যাগ করতে হবে যে, মানুষের আত্মা থেকে আলাদা একটা দেহ আছে ; এটা আমি শয়তানি কায়দায় ছেপে দেখাবো, ক্ষার প্রয়োগ করে, নরকে যা উপকারী ও রোগহর, আপাত আড়ালের ভেতর দিয়ে গলিয়ে লুকিয়ে-থাকা অসীমকে বাইরে বের করে আনবে ।
উপলব্ধির দুয়ারের মলিনতা যদি দূর করা যায়, মানুষের সামনে প্রতিটি জিনিস স্বরূপে প্রতিভাত হবে, অনন্ত প্রতিমার রূপ ধরে ।
কেননা মানুষ নিজেকে বন্দী করে রেখেছে, যতক্ষণ না সংকীর্ণ ফাটল দিয়ে তারা সারা জগতকে দেখতে পাচ্ছে ।
অন্য একটি স্মরণীয় কল্পনা
নরকের একটা ছাপাখানায় আমি ছিলুম, আর দেখলুম প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জ্ঞান সম্প্রসারিত হচ্ছে ।
প্রথম প্রকোষ্ঠে ছিল একজন ড্রাগন-মানুষ, গুহামুখ থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করছিল ; ভেতরে গুহাটাকে পরিষ্কার করছিল আরেক ড্রাগন ।
দ্বিতীয় প্রকোষ্ঠেও গুহা আর সেখানে পাথরপিণ্ডকে জড়িয়ে রয়েছে এক বিষধর সাপ এবং অন্যান্যরা তাকে সাজিয়ে তুলেছে সোনা, রুপো ও দামি গ্রহরত্নে ।
তৃতীয় প্রকোষ্ঠে ছিল একটি ঈগলপাখি, যার পালকগুলো বাতাসের ; গুহার ভেতরটা অনন্তে পালটে দিলে সে । ঈগলের মতন দেখতে অসংখ্য মানুষ চারিধারে, তারা প্রাসাদ গড়ছিল আকাশচুম্বী চূড়ায় ।
চতুর্থ প্রকোষ্ঠে ছিল চারিধারে গর্জনরত আগুনশিখার সিংহ, এবং খনিজ তরল পদার্থ গলাচ্ছিল ।
প্রঞ্চম প্রকোষ্ঠে ছিল নামহীন কায়া, যারা খনিজগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছিল বিশাল দিগন্তে ।
সেখানে সেগুলোকে লুফে নিচ্ছিল ষষ্ঠ প্রকোষ্ঠের জবরদখলকারী মানুষেরা, আর সেগুলো গ্রন্হের আকার নিচ্ছিল এবং তাদের পাঠাগারে গুছিয়ে রাখা হচ্ছিল ।
যে দানবগুলো এই পৃথিবীকে ভোগবাসনার সংসারে পর্যবসিত করেছিল, এবং এখন হয়তো সেখানে শেকলবাঁধা অবস্হায় রয়েছে, আসলে তা তাদের জীবনের ও সকল কর্মস্রোতের উৎস ; কিন্তু শেকলগুলো আদপে দুর্বল ও পোষমানা মনের চাতুর্য, যা তেজকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে : সেই প্রবাদ অনুযায়ী, “যে দুর্বল সে চাতুর্যে শক্তিমান ।”
অতএব সংসারের একটা এলাকা বহুপ্রসু, অপরটি সর্বগ্রাসী : যে সর্বগ্রাসী তার মনে হয় যারা সৃষ্টি করে তারা শৃঙ্খলিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক নয় ; সে কেবল সংসারের টুকরোগুলো জড়ো করে, আর তাকেই সমগ্র বলে মনে করে ।
কিন্তু বহুপ্রসূ আর বহুপ্রসূ থাকবে না যদি না সমুদ্ররূপী সর্বগ্রাস তার মাত্রাতিরিক্ত পরমানন্দকে গ্রহণ করে । অনেকে বলবেন, “কেবলমাত্র ঈশ্বর কি বহুপ্রসূ নন ?” আমি উত্তর দেবো, “ঈশ্বর কেবল কার্যসম্পাদন করেন, এবং জায়মান সংসারে অথবা মানব সম্প্রদায়ে তিনি উপস্হিত ।”
পৃথিবীতে এই দুই ধরণের মানুষ সবসময়ে থাকে, আর তারা নির্ঘাত পরস্পরের শত্রু ; যারা তাদের মিটমাট করাতে চায়, তার পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে চায় ।
ধর্ম হল সেই দু’জনের মিটমাট ঘটানোর প্রয়াস ।
উল্লেখ্য : যিশুখ্রিস্ট তাদের মিল ঘটাতে চাননি, বরং চেয়েছেন আলাদা করে দিতে, যেমন আমরা ভেড়া আর ছাগলের নীতিকথায় পাই । এবং তিনি বললেন, “আমি শান্তির জন্য নয়, এসেছি তরবারির জন্য ।”
এর আগে পয়গম্বর অথবা শয়তান অথবা লুব্ধককে মনে করা হতো মহাপ্রলয়ের পূর্বেকার, যা কিনা আমাদের কর্মশক্তি।
আরেকটি স্মরণীয় কল্পনা
একজন দেবদূত আমার কাছে এলেন আর বললেন, “ওহে, ক্ষুদ্র নির্বোধ যুবক ! ওহ ভয়ানক ! ভয়ঙ্কর তোমার অবস্হান ! অনন্তকালব্যাপী যে জলন্ত গনগনে অন্ধকার কারাকক্ষের উদ্দেশে নিজেকে তুমি গড়ে তুলছো, তা একবার ভেবে দেখো, যেদিকে অমন এক বাহনে চেপে তুমি এগিয়ে চলেছো ।”
আমি বললুম, “তুমি হয়তো আমাকে আমার অবিনশ্বর ভালোমন্দ দেখাতে চাইবে, এবং আমরা দুজনে এই বিষয়ে বিবেচনা করব, আর যাচাই করব তোমার না আমার কার ভালোমন্দ সর্বাধিক কাম্য ।”
তাই উনি আমায় পিঁজরেপোলের ভেতর দিয়ে নিয়ে গেলেন, তারপর গির্জার মধ্যে দিয়ে, আর তারপর গির্জার কোষাগারে, যার শেষপ্রান্তে ছিল ঘানিকল ; আমরা ঘানিকলের ভেতর দিয়ে এগোলুম, আর পৌঁছোলুম এক গুহায় ; পাকানো খাদ বেয়ে একঘেয়ে যাত্রাপথ হাতড়ে আমরা নামতে লাগলুম, যতক্ষণ না আমাদের নিচের দিকে ঢালু আকাশের মতন এক অসীম শূন্যতা দেখা গেল ; এবং গাছের শেকড় আঁকড়ে আমরা এই বিশাল শূন্যতায় ঝুলে রইলুম ; কিন্তু আমি বললুম, “তুমি যদি চাও তাহলে আমরা এই মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাবো, আর দেখবো এখানেও ভগবান আছেন কিনা ; তুমি যদি না চাও, তাহলে আমি একাই যাবো ।” কিন্তু উনি প্রত্যুত্তর দিলেন, “কেবল অনুমান কোরো না, হে যুবক, বরং আমরা যতক্ষণ এখানে রয়েছি, তুমি নিজেকে সামলাও, কেননা অন্ধকার কেটে গেলেই আবির্ভাব ঘটবে ।”
তাই আমি সারাক্ষণ ওনার সঙ্গে রইলুম, বসে রইলুম ওকগাছের জটপাকানো গুঁড়ির ওপর ; অতলমুখো হয়ে ছত্রাকে ঝুলে রইলেন উনি ।
জ্বলন্ত শহরের আবেগময় ধোঁয়ার মতন দেখতে অনন্ত রসাতলকে আমরা একটু-একটু করে দ৩এখলুম, আমাদের পায়ের তলায় বহুদূরে ছিল সূর্য, কালো অথচ ঝকঝকে ; তাকে ঘিরে অগ্নিময় গমনপথে পাক খাচ্ছিল বিশাল মাকড়সার দল, হামাগুড়ি দিচ্ছিল শিকারের পেছন পেছন, সেগুলো উড়ছিল, বা বলা যায় সাঁতার কাটছিল, ওই অতল অনন্তে, ভ্রষ্টাচার থেকে চাগিয়ে ওঠা বিকট জানোয়ারের চেহারায়, আর তারা বাতাসে কিলবিল করছিল আর মনে হচ্ছিল তাদের নিয়েই গড়ে উঠেছে হাওয়া । ওগুলো সবকটা আসলে রাক্ষস, আর ওদের নাম হলো বাতাসের ক্ষমতা । আমি এবার আমার সহযাত্রীকে জিগ্যেস করলুম যে, “আমার অবিনশ্বর ভালোমন্দ বলতে কী বোঝায় ;” উনি জানালেন, “তা রয়েছে কালো আর সাদা মাকড়সার মাঝখানে ।”
Malay Roychoudhury
Subscribe to:
Posts (Atom)

